অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো...
প্রকৃতির নিয়মে ঋতু পরিবর্তনে উৎসবের লগ্ন উপস্থিত হলেও তার আনন্দ-উদ্যাপন সব সময় এক সুরে বাঁধা থাকেনা। যেমন এবারের শারদোৎসব ও দশেরার প্রাক্ মুহূর্তে দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছে তরুণ ছাত্র-যুবদের তুমুল প্রতিবাদ আর দ্রোহে-বিক্ষোভে। তারা নিছক নিজেদের চাওয়া-পাওয়া বা দাবিতে নয়, দেশবাসীর গণতান্ত্রিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা ও দেশের সংবিধান বাঁচানোর মতো মহত্তর দায় নিজেদের ওপর স্বেচ্ছায় চাপিয়ে প্রতিবাদ ধ্বনিত করতে রাস্তাকেই অবলম্বন করেছে।
এক দুঃসহ ঘন আঁধার যেন জাঁকিয়ে বসেছে দেশের বুকে। দেশের শাসন ক্ষমতায় যারা আসীন,তারা তাদের আধিপত্যকে আরও দীর্ঘায়িত করার মোহে এই আঁধারকে উৎপন্ন করেছে। যারা আঁধারকে প্রোথিত করে শাসনতন্ত্রকে প্রলম্বিত করতে চায়, তাদের চিন্তায়, কাজে তো দুর্বৃত্তপনা থাকবেই। যা দেশের মানুষ নিয়ত প্রত্যক্ষ করছেন জাত-পাত-ধর্মের নামে, দেশ চালানোর ক্ষেত্রে, মতাদর্শের নামে মধ্যযুগীয় ভাবনা আর অজ্ঞানতাকে স্থাপন করতে শিক্ষা-সংস্কৃতির অন্তর্জলিযাত্রার মাধ্যমে, সকল বিরুদ্ধমত ও কণ্ঠস্বরকে রুদ্ধ করার স্বৈরাচারী প্রবণতায় এবং দেশের রাষ্ট্রকাঠামো ও সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে পদদলিত করে রাখার ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের নগ্ন উন্মোচনের মধ্যে।
এই দুর্বৃত্তপনারই এক বিকট রূপ ফুটে উঠতে দেখা গেছে নিটকাণ্ডের মতো পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতিতে। যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দিল্লির যন্তর মন্তরে মাস তিনেক আগে শুরু হওয়া ছাত্র-যুবদের দুর্বার আন্দোলন দেশের শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে।
সম্প্রতি 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' পত্রিকার একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনের মাধ্যমে আবারও এক ভয়ংকর দুর্নীতি তথা মারাত্মক অপরাধের কাহিনি জনসমক্ষে এসেছে। এবারে অভিযোগ উঠেছে দেশের নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম নিয়ে,যা গোটা দেশকে একেবারে নাড়িয়ে দিয়েছে। জানা গেছে,তিনজন নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে দু'জনের সম্মতি ছাড়াই বেশকিছু গুরুতর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিজের ইচ্ছেমতো কমিশন পরিচালনা করেছেন এবং সমস্ত সিদ্ধান্তই নিয়েছেন একতরফাভাবে কেন্দ্রে আসীন সরকার ও শাসকদলের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে। এই উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে এস আই আর-এর নামে অন্যায়ভাবে ১৩ কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে কেন্দ্রের শাসকদলকে পশ্চিমবঙ্গ সহ বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনে সাফল্য পেতে সাহায্য করা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এসআইআর-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে বিরোধী ভোটার, সংখ্যালঘুদের নাম বাতিল করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রথম থেকেই নানা প্রশ্ন,সংশয় ও অসংগতি দেখা দিয়েছে। প্রতিবাদও হয়েছে। তবে এবারে এটা নিছক আর পাঁচটার মতো একটা দুর্নীতি বা অপরাধের ঘটনা নয়, এর অভিঘাত অত্যন্ত গভীর। যা দেশের গণতন্ত্র, সংবিধান, সংসদীয় ব্যবস্থার ভিতকে দুর্বল করেছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই আজ নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষ ভূমিকা বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সংগতভাবেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি জোরালোভাবেই উঠেছে। দেশের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যদি প্রশ্ন ওঠে তবে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থাও টলে যায়। কাজেই সচেতন ও সংবেদনশীল তরুণ-যুব সমাজ মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন। দেশের সমস্ত বিরোধীদল,নাগরিক সমাজ,শিল্পী-বুদ্ধিজীবী সকলেই জোটবেঁধে তরুণ-যুবসমাজের এই লড়াইয়ের প্রতি সংহতি জানিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন। ফলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন আরও তীব্র ও ব্যাপক আকারে দেশময় ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে কেন্দ্রের সরকার তার সমস্ত শক্তি নিয়ে এই আন্দোলনকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আন্দোলনকারীদের ওপর কেন্দ্রের পুলিশ ও সেনাবাহিনী বর্বরোচিত হামলা চালাচ্ছে। ছাত্র-যুব এবং বিরোধীদলের কর্মীরা যাতে যন্তর মন্তর সহ দিল্লির রাজপথে মিছিল-বিক্ষোভে অংশ নিতে না পারেন সেজন্য ব্যারিকেডে ব্যারিকেডে শহরকে দুর্ভেদ্য নগরীতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। চলছে হুমকি,বাড়ি ও আবাসস্থলে হানাদারি, ত্রিবর্ণ জাতীয় পতাকা নিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জন্য গ্রেপ্তার করা হচ্ছে ছাত্র-যুব নেতা-নেত্রীদের। মহিলা সাংবাদিকদেরও রেহাই মিলছে না। আন্দোলনকারীদের পাশাপাশি তাঁদের উপরও আক্রমণ, এমনকী তাঁদের শারীরিক লাঞ্ছনা পর্যন্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে যেন দেশে কালো অমানিশা জাঁকিয়ে বসেছে, অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে। তবুও নির্ভীক-অকুতোভয় তরুণ-যুবসমাজ দেশ ও দেশের সংবিধান এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সংকল্পে এই আন্দোলনকে আরও দুর্বার গতিতে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। তারা দৃঢ়তার সঙ্গেই ঘোষণা করেছেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত জারি থাকবে এই আন্দোলন।
এমনই এক প্রতিবেশ বীরেন চট্টোপাধ্যায়ের সেই ('মে দিন ১৯৬৫') কবিতাকে স্মরণ করাচ্ছে –
"আয় কালবৈশাখী হাওয়া, উড়িয়ে নে
শুকনো আবর্জনা, ধুলো, মৃত্যু অপমান!
আন বুকে স্পর্ধা, কণ্ঠে জীবনের গান
অন্ধ, বোবা আমার স্বদেশে!...
আয় কালবৈশাখী হাওয়া, ঝড় আন্
বুকের ভিতর, ভারতবর্ষকে দেখি অন্যভাবে, শপথে আলোকে।
কে আর অনন্ত কান্না পুষে রাখে, পুড়ে যায় শোকে?
চারদিকে নবজন্ম, দেশে দেশে শঙ্খ বাজে, শোনা যায় মানুষের গান।"
এই সামগ্রিক প্রেক্ষিতে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে – মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে বাঁচাতে সরকারের এমন আগ্রাসী তৎপরতা কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
আশ্বিনের শারদোৎসব বাংলার অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উৎসব। এই উৎসব বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে। আবহমানকাল ধরে শান্তি-সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে এসেছে এই উৎসব। একমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া এই উৎসব লগ্নে কখনও কোনো বিরূপ ছায়া পড়তে দেখা যায়নি। কিন্তু এবারে এক অস্থির অশান্তির আবহ যেন এই উৎসবকে আবিল করতে চাইছে। আর এই অবস্থার সূচনা হয়েছে প্রশাসনের একেবারে শীর্ষমহল থেকে শুরু করে নিচুতলার 'ক্ষমতাসীন'দের নির্বোধ হুঙ্কারে। বাঙালির ওপরে খাদ্যাভাস চাপিয়ে দেওয়া, শরতের উৎসবকে শারদোৎসব বলায় নিষেধাজ্ঞা এবং বামপন্থী ও প্রগতিশীলদের উৎসবকে কেন্দ্র করে পুস্তক বিপণি করতে না দেবার ফতোয়া জারি ইত্যাদি উৎসবের পরিবেশকেই বিঘ্নিত করছে। এরা এমন একটা ধারণার বিস্তার ঘটাতে চাইছে যেন এর আগে রাজ্যে এই উৎসব সেভাবে হয়ইনি! ওরা বাঙালিকে ইতিহাস-সংস্কৃতির পাঠ দিচ্ছে ! আর অন্যদিকে রাজ্যে বিদ্যাসাগর, রামমোহন, বিবেকানন্দ,রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল,সুকান্ত, রাহুল সাংকৃত্যায়ন-এর মতো মনীষীদের নির্বিচারে অবমাননা চলছে!
তাই শারদোৎসবের মুহূর্তে এই সমস্ত দিক আড়াল করে উৎসবে মগ্ন হওয়া কঠিন। সমস্ত অন্যায়-অপহ্নব-দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই এবং এই অন্ধকার সময়কে পালটানোর দৃঢ়তা নিয়েই দেশব্যাপী চেতনার অভিযাত্রীরা শামিল আশ্বিনের এই শারদোৎসবে। এই আবহেই প্রকাশিত হচ্ছে আমাদের ই-পত্রিকা 'ডটপেন ডট ইন'-এর উৎসব সংখ্যা। আমরাও এই চেতনা নিয়েই অগ্রসর হতে চাই অন্ধকার ভেদ করে আলোর অভিযাত্রায়, আমাদের চারপাশে প্রতিধ্বনিত হোক রবীন্দ্রনাথের সেই অমোঘ পঙ্ক্তি –
"অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো
সেই তো তোমার আলো!
সকল দ্বন্দ্ববিরোধ-মাঝে জাগ্রত যে ভালো
সেই তো তোমার ভালো।"...
১৫ অক্টোবর, ২০২৬