প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

'একাত্তরের দুর্নিবার নারী মুক্তিযোদ্ধা ও দুঃসহ স্মৃতি' গ্রন্থ নিয়ে কিছু কথা



ঝর্না রহমান


'একাত্তরের দুর্নিবার নারী মুক্তিযোদ্ধা ও দুঃসহ স্মৃতি' বাংলাদেশের কয়েকজন নারী মুক্তিযোদ্ধার অভিজ্ঞতার বয়ানসমৃদ্ধ একটি সংকলন গ্রন্থ। সম্পাদনা করেছেন এই প্রতিবেদক (কথাসাহিত্যিক ঝর্না রহমান)। বইটি ২০২৬ সনে 'সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ ৭১'-এর উদ্যোগে পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে।

'সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ ৭১' মূলত একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সমবায়ে গঠিত একটি সংগঠন, যার জন্ম হয়েছিল ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিতে আন্দোলনের ফোরাম রূপে। এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ ও চেতনা বিকাশের আন্দোলনে ভূমিকা রাখা। ফলে সে সময় এই ফেরাম সারা বাংলাদেশে একাত্তরের গণহত্যা ও নারী ধর্ষণে পাকিস্তানি বাহিনীকে সাহায্য ও সমর্থন করা রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনীর সদস্য ও অন্যান্য বিশ্বাসঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সারা দেশে একটি জনমত গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছিল। এ সংগঠন দেশে বিদেশে বাংলাদেশের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছে। এ ফোরামের নারী শাখাটির নাম কেন্দ্রীয় নারী কমিটি। সভাপতি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নৃত্যগুরু লায়লা হাসান। গ্রন্থের সম্পাদকও নারী কমিটির প্রকাশনা ও দফতর সম্পাদক। এ বই মূলত কমিটির মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক কার্যক্রমের একটি ফসল। এমন একটি বই প্রকাশের জন্য কেন্দ্রীয় নারী কমিটির প্রত্যাশা ও স্বপ্ন ছিল বহুদিনের। স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেতে সময় লেগেছে প্রায় চার বছর।

কেন্দ্রীয় নারী কমিটি সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামেরই একটি অংশ। এই কমিটির অধিকাংশ সিনিয়ার সদস্য বা বয়োজ্যেষ্ঠ নারীগণই বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং অপেক্ষাকৃত নবীনারাও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। এদের প্রত্যেকের রয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন অসামান্য সব অভিজ্ঞতা। এরা কেউ কেউ সরাসরি রণাঙ্গণে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার পাশাপাশি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, কেউ কেউ ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবিরে যুদ্ধের জন্য যুদ্ধাস্ত্র চালাবার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং আরও মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন, প্রাণের ভয় উপেক্ষা করে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র খাদ্য টাকাপয়সা দিয়ে সহায়তা করেছেন, কেউ কেউ যুদ্ধের প্রারম্ভকাল থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থেকেছেন, ভয়ভীতি তুচ্ছ করে ঝাঁপ দিয়েছেন বিপজ্জনক কর্মযজ্ঞে। অনেকেই লাভ করেছেন ভয়াবহ নির্যাতনের অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতাগুলো ইতিহাসের অংশ। বইটিকে তাই এক অর্থে বলা চলে আকর গ্রন্থ।

একাত্তর ছিল আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে উল্লেযোগ্য ঘটনা এবং গৌরবময় ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ পর্যন্ত অনেক গবেষণা, অনেক তথ্য সংগ্রহ ও ইতিহাস রচনা এবং অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতা গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হয়েছে। কিন্তু তার পরেও, আজও, মুক্তিযুদ্ধের অনেক ঘটনা, অনেক তথ্য, বহু মুক্তিযোদ্ধার সাহসী লড়াইয়ের কাহিনি, বহু মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস রয়ে গেছে অজানা। বিশেষ করে নারী মুক্তিযোদ্ধা ও নির্যাতিত নারীর অসামান্য ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা অধিকাংশই রয়ে গেছে অন্তরালে।

এ-যুদ্ধে কতভাবে কত নারী সম্পৃক্ত ছিলেন, তারও সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া আজ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতার পরে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে অনন্তলোকে হারিয়ে গেছেন অগণিত মানুষ, যাদের মধ্যে ছিলেন অজ্ঞাত নারী যোদ্ধা ও নির্যাতিতা নারী। তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা জানা হয়নি। তাঁদের খবর জানা, মানুষটি সম্পর্কে জানা এবং তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা কত যে কঠিন কাজ তা এ বিষয়ে গবেষণা করতে নামলে টের পাওয়া যায়। বিস্মৃতির বাস্তবতা তো আছেই, সেই সঙ্গে থাকে সংশ্লিষ্ট নারীটির পূর্ণাঙ্গ পরিচয়, যুদ্ধকালীন বা অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণের মানসিকতার অভাব, আলস্য, আপনজনের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রামের তাগিদে পরিবার বা আত্মীয় স্বজনের মধ্যে গৌরবান্বিত নারীটি সম্পর্কে জানা ও তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে অবহেলা, গবেষকদের সহায়তা না করা, সামাজিক কলঙ্ক, নিন্দা, অবজ্ঞার ভয় — এমন নানা কারণে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নারীর খবর হারিয়ে যায়। এমনকী কারো কথা জানলেও তাঁর প্রকৃত নামটি খুঁজে বের করাই অনেক সময় দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। এভাবেই জীবিত কিংবা শহিদ কিংবা লাঞ্ছিতা নারী মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড়ো অংশ ইতিহাসের অন্তরালে রয়ে গেছে।

নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞায়িত করার মধ্যেও খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। কত নারী কতভাবে এই যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন? যাঁরা শুধু রণাঙ্গণে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন বা শহিদ হয়েছেন তাঁরাই কেবল মুক্তিযোদ্ধা? যে নারী তাঁর স্বামী বা সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়ে দিয়েছেন তাঁর ত্যাগের কি কোনো পরিমাপ করা যায়? যে নারী পাকসৈন্য বা রাজাকারের হাতে ধর্ষিতা হয়েছেন, নৃশংস অত্যাচারের কারণে নিহত হয়েছেন, সম্ভ্রম হারিয়ে পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, হারিয়েছেন সামাজিক মর্যাদা, অসীম ঘৃণা ও লজ্জায় আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগের মহিমা পরিমাপ করা হবে কোন তূলাদণ্ডে? একাত্তরে কত নারী তাঁর সম্ভ্রম দিয়ে যুদ্ধ করেছেন? এক সময় মনে করা হতো দু'লক্ষ মা বোন ধর্ষিতা হয়েছেন। কিন্তু যতই গবেষণা করা হচ্ছে এ সংখ্যা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বলা হচ্ছে এ সংখ্যা চার লক্ষেরও বেশি। কেন এই সংখ্যা বৃদ্ধি? যুদ্ধের পর পর এই সব ধর্ষিতা নারী, যাঁরা নৃশংস অত্যাচার নির্যাতনের পরও বেঁচে ছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই লোকনিন্দার ভয়ে নিজেদেরকে লোকচক্ষুর আড়ালে ঢেকে নিয়েছিলেন। নিজেদের দুর্দশার কথা প্রকাশ করেননি। কিন্তু সময় পার হতে থাকলে সমাজে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন হয়েছে, অনেক নারী বা তাঁর পরিবারের লোকজনও এই আত্মত্যাগকে গৌরবের চোখে দেখতে সমর্থ হয়েছে। তখন তাঁদের বেদনার ইতিহাস জানাতে আর দ্বিধা বোধ করেনি। তবে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত ইতিহাস অলিখিতই রয়ে গেছে। শুধু ইতিহাসে নয়, কাব্য সাহিত্য গল্প উপন্যাসে কালজয়ী এই ঘটনা এখনও ব্যাপক ও মহিমান্বিত আকারে উঠে আসেনি। অন্যান্য শিল্প মাধ্যমেও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, তাঁদের আত্মত্যাগের প্রকৃত চিত্র সেভাবে উঠে আসেনি। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত সাহিত্যে বা চলচ্চিত্রে একাত্তরের নারীকে শুধু ধর্ষিতা হিসেবে দেখানোর মধ্যেই যেন সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের অন্যান্য ভূমিকার কথা সেভাবে বর্ণিত হয়নি। আমরা কি কোনো ইতিহাসে, কোনো সাহিত্যে এখনও দেখতে পেয়েছি একাত্তরে কেমন করে নারীরা কাজ করেছেন যুদ্ধক্ষেত্রে, চিকিৎসা শিবিরে, গোপন মিটিংয়ে, মিছিলে বা শত্রুশিবিরের ক্যাম্পে? আহত সৈন্যদের চিকিৎসা সেবা দিতে কেমন করে বিনিদ্র রজনী যাপন করেছেন নারী চিকিৎসক বা সেবিকা, কেমন করে তাঁরা দ্বারে দ্বারে ঘুরে সংগ্রহ করেছেন ঔষধ বা চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার টাকা. কেমন করে তারা মেয়েদেরকে সংগঠিত করেছেন, কেমন করে কত দুস্তর বাধা পেরিয়ে তারা প্রশিক্ষণ শিবিরে গিয়েছেন কিংবা সেখানে কীভাবে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছেন! মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছু ভালো চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও, মুক্তির গান, আগুনের পরশমণি, গেরিলা বা হাঙর নদী গ্রেনেডের মতো মুষ্টিমেয় ক'টি চলচ্চিত্র বা তথ্যচিত্র ছাড়া আর তেমন কোনো সিনেমাও নেই, যেখানে নারীর আত্মত্যাগ, নারীর অংশগ্রহণ বা লড়াইকে স্পষ্ট করে দেখানো হয়েছে। অথচ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে নারীর অবদান ও আত্মত্যাগের রয়েছে এক মহিমান্বিত উপাখ্যান, প্রকৃতপক্ষে, যা আজও লিখিত হয়নি। নারীর কথাগুলো যেন উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। কালের আবর্তনে একদিন মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলেই চলে যাবেন। তাঁদের কথাগুলো হারিয়ে যাবে। কালের অতলে তলিয়ে যাবে একটি দেশের জন্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত নারীদের অসংখ্য বীরত্বপূর্ণ ঘটনা ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা।

কেন্দ্রীয় নারী কমিটিতে এমন অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং এখনও কেউ কেউ আছেন, যাঁদের রয়েছে অসামান্য সব অভিজ্ঞতা। এই কমিটির সভাপতি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শিরিন বানু মিতিল, যিনি পুরুষের ছদ্মবেশে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পরে তাঁর পরিচয় প্রকাশিত হয়ে পড়লে তাঁর পক্ষে আর সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময় নারী কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগীত ও নাট্যশিল্পী বুলবুল মহলানবীশ। প্রথম থেকেই যিনি স্বাধীনতা আন্দোলন সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। কত দুর্মর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে তিনি সীমান্ত পার হয়ে গিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে। একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বর বিজয়ের মুহূর্তে কেমন করে গেয়েছিলেন সেই অমর গান 'বিজয় নিশান উড়ছে ঐ' — এসব অভিজ্ঞতার মূল্য কী দিয়ে পরিশোধ করা যায়?

আলোচ্য বইয়ে আমরা এমন বিয়াল্লিশজন নারীর কথা সংকলিত করেছি। তবে কয়েকজনের ক্ষেত্রে আপন অভিজ্ঞতার বয়ান নেওয়া সম্ভব হয়নি। যেমন তারামন বিবি বীরপ্রতীক, আনোয়ারা বাসিত, আজিজা ইদিরিস, মিলি চৌধুরী বা আরও কয়েকজন। এঁদের সম্পর্কে অন্য ব্যক্তি লিখেছেন। তারামন বিবির অবশ্য বিভিন্ন চ্যানেলে কয়েকটি সাক্ষাৎকার রয়েছে, যেগুলো একাত্তরে তাঁর আপন অভিজ্ঞতারই বয়ান। কিছু বর্ণনা আছে সংশ্লিষ্ট নারী যোদ্ধার আপনজনের। তবে, কী নিজের কথা, কী অপরের বিবরণ, সব লেখার মধ্যেই আমরা পাবো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নানারকম অভিজ্ঞতার চিত্র। এসব অভিজ্ঞতা আমাদেরকে একাধারে গর্বিত, শিহরিত এবং বিষণ্ন করে। কত সংগ্রাম, দুঃসাহসিকতা, নির্যাতন, কত ভয় আর আতঙ্কের ভেতর দিয়ে তাঁরা দেশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করেছেন! কত নারীর কত বীরত্ব আর কত মহান আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা!

রাজাকার, আলবদরদের সহায়তায় অপহৃত ও অমানুষিক নির্যাতনের পরে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে পাকবাহিনির হাতে নিহত নারী সাংবাদিক সেলিনা পারভীন, মীরপুরে বিহারীদের সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় নিজ বাসভবনে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত কবি মেহেরুন্নেসা, মাগুরার লুৎফুন্নেসা, ডাক্তার আয়শা বেদৌরা, পিরোজপুরের ভাগীরথী সাহা — মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করার অপরাধে যাকে মোটর সাইকেলের সঙ্গে বেঁধে রাস্তার ওপর দিয়ে টেনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল, সৈয়দপুরের ভ্রমর রাখাইন, পার্বতীপুরের আনজুমান — যাঁকে ট্রেনের জ্বলন্ত কয়লার গনগনে চুল্লিতে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল, যশোরে পাক বাহিনির গুলিতে প্রথম শহিদ চারুবালা কর — যাঁর মৃতদেহ নিয়ে কালো পতাকা হাতে স্থানীয় জনতা বিশাল মিছিল করেছিল — এই নামগুলো আমাদের স্মৃতিকে দুমড়ে মুচড়ে দেয় আজও। এরকম আরও কত নাম তথ্য সংরক্ষণের অভাবে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে তার হিসেব নেই। আইভি রহমান, সাজেদা চৌধুরী, ক্যাপ্টেন সেতারা বেগম, মতিয়া চৌধুরী, আয়শা খানম, মালেকা বেগম, আমেনা আহমেদ, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়, বিভা, মণিকা, ডা. লায়লা, ডা. দীপা, গীতা কর, ইরা কর, পারভীন ডলি, সন্ধ্যারানী বিশ্বাস, মুকুল মজুমদার, জিনাতুন নেসা তালুকদার, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত আরও কত নারী নেত্রী, গেরিলা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী যোদ্ধাদের নাম আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে আছে! সেখানে বিয়াল্লিশ নারীর সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল। তবুও এদেঁর অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে এই দেশের স্বাধীনতার পেছনে কত মানুষের কতরকম অবদান আর আত্মত্যাগ রয়েছে, যার কোনো তুলনা হয় না, যার কোনো সংখ্যা নির্ণয় করাও সত্যিই অসম্ভব।

এ বইয়ে যাঁদের কথা রয়েছে তাদের অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের শিহরিত করবে। তারামন বিবির কথা এখন সারা দেশ জানে। কিন্তু বহুবছর এই বীর নারীর কথা ছিল অজানা। এখন আমরা জানি, কেমন করে এই গ্রামীণ নারী নিজেকে পঙ্গু পাগলিনী সাজিয়ে গায়ে মাথায় ময়লা আবর্জনা, এমনকী মলমূত্র মাখিয়ে নদী সাঁতরে পার হয়ে, মাটিতে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে পাক বাহিনির ক্যাম্পে যেতেন খবর সংগ্রহ করার জন্য। শিরিন বানু মিতিল চুল কেটে পুরুষের পোশাকে যুদ্ধে গিয়েছিলেন, কিশোরীদের নিয়ে সংগঠন গড়েছেন, পরবর্তী সময়ে বলেছেন 'আমি প্রীতিলতার মতো দুঃসাহসী হতে চেয়েছিলাম। যতক্ষণ প্রাণ আছে দেশের জন্য লড়ার সংকল্প করেছিলাম।' রোকেয়া কবীর যুদ্ধকালীন মেয়েদরকে অস্ত্র চালনা, ফার্স্ট এইড দেওয়া, ব্যারিকেড তৈরি করা ইত্যাদির ট্রেনিং দিয়েছেন, ফোরকান বেগম সম্মুখ যুদ্ধে নেমেছেন, বরিশালের করুণা বেগম, শোভারানী, বীথিকা বিশ্বাস, শিশিরকণা, সাহানারা শোভা, গোপালগঞ্জের আশালতা বৈদ্য, মেহেরুন্নেসা, পটুয়াখালির মনোয়ারা বেগম, যশোরের সালেহা বেগম, সুনামগঞ্জের পেয়ারচান প্রমুখ মেয়েদের নিয়ে দল গড়েছেন, তাঁদেরকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, বিশ্বের বীর নেতাদের জীবনী পাঠ করে শোনাতেন, নানাভাবে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ডা. মাখদুমা নার্গিস শিশুকন্যাকে সহযোদ্ধাদের তত্ত্বাবধানে রেখে আগরতলা ক্রাফটস হোস্টেল শরণার্থী শিবিরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করতেন, বুলবুল মহলানবীশ সদ্য বিবাহিতা তরুণী, স্বামী চলে গেলেন যুদ্ধে, শত্রুর হামলা প্রতিরোধ করার জন্য বাঁশ কেটে সুচালো করে অস্ত্র বানাতেন, পাথরের টুকরো সঙ্গে রাখতেন গুলতিতে ব্যবহারের জন্য, আঁচলে বেঁধে রাখতেন বিষাক্ত করবী গোটা, যাতে শত্রুর হাতে ধরা পড়লে প্রীতিলতার মতো আত্মহননেও পিছপা না হন। লুবনা মারিয়ামের লেখায় আমরা দেখব, তিনি ভারতের কল্যাণী শরণার্থী শিবিরের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা যেন কবি অ্যালেন গিনসবার্গের সেই বিখ্যাত কবিতা 'সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড'-এর চেয়ে কোনো অংশে কম করুণ নয়। আভা দত্তের লেখায়ও রয়েছে ভারতে শরণার্থী হয়ে পথ চলার মর্মান্তিক বর্ণনা। সোনাখিরা শরণার্থী শিবিরের ধাত্রীমাতার কাজ করেছেন ষোড়শী চক্রবর্তী। সেই অভিজ্ঞতাও তো আমাদের জন্য কম গৌরবের নয়! সুলতানা কামাল, সাঈদা কামাল আগরতলার সোনামুড়া গ্রামের হাসপাতালে ডাক্তারদের সঙ্গে কাজ করতেন। কতখানি উৎকণ্ঠা আর দায়িত্বশীলতা নিয়ে তারা সোনামুড়া থেকে দারোগাবাগিচায় অন্য হাসপাতালে গিয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রক্ত সংগ্রহ করে আনতেন, এসব অভিজ্ঞতার বয়ান আমাদের আন্দোলিত করবে। কমলারানী কর ১০ মার্চ তারিখে রাম-দা হাতে নিয়ে মিছিলে নেমেছেন। মর্টারের আঘাতে ফুসফুস বেরিয়ে পড়া এক যোদ্ধা তার কাছে ডাবের পানি খেতে চেয়েছিলেন। চাঁদা তুলে ডাব কিনে আনতে আনতে সেই যোদ্ধা চিরঘুমে ঘুমিয়ে পড়েছেন। সারা জীবনের আর ডাব খাননি কমলারানী। আগরতলার কোনাবন ক্যাম্প, সূর্যমণিনগর ক্যাম্প, হাপানিয়া ক্যাম্প, আমতলী, গোকূলনগর, ডুলাইবাড়ি, বিশালনগর, বরদোয়ালী কত ক্যাম্পে কাজ করেছেন, বিজয়ের পরে ময়নামতি ক্যাম্প থেকে নির্যাতিতা নারীদের জিবি হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন আর নারীরা তখন তার কাছে বিষ চাইছিলেন — কত মর্মন্তুদ সেই অভিজ্ঞতা, জয়ন্তী রায়কে তাঁর দাদু অজয় রায়ের হাতে সম্প্রদান করে কপালে সিঁদূর দিয়ে রণাঙ্গণে পাঠিয়েছিলেন, রাখী দাশ পুরকায়স্থ করিমগঞ্জের বেস ক্যাম্প, আনিপুর ক্যাম্প, হরিণটিলা, পেপারটিলার নানা বাংকারে ঘুরে বেড়িয়েছেন। নির্যাতিতা বিবস্ত্র নারীদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছেন চিকিৎসার জন্য। ফেরদৌসী হক লিনু এসএম হলের সীমানা দেয়ালের বল্লম আকৃতির রড খুলে অস্ত্র বানিয়ে সাথিদের নিয়ে লড়াই করেছেন — যে কারণে তাদেরকে বলা হত বিচ্ছু মেয়ে। দীপা খন্দকার পলায়মান জীবনে মায়ের কাছে রেখেছেন দেশের পতাকা। হাজার বিপদেও সেই পতাকা ছাড়েননি, শরণার্থী শিবিরে টাঙিয়ে দিয়েছিলেন। অন্তহীন পথ চলার এক মর্মস্পর্শী বর্ণনা পাওয়া যাবে তাঁর লেখায়। কতভাবে আমাদের দেশের দুঃসাহসী নারীগণ যুদ্ধ করেছেন, রণাঙ্গণে নেমেছেন, জীবন বাজি রেখে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পৌঁছে দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে — এসব ইতিহাসের সবটা আমরা কোনোদিনই হয়তো পাবো না।

এ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ৪২ জনের লেখার মধ্যে ১০টি লেখা সংশ্লিষ্ট নারী মুক্তিযোদ্ধার আপনজন বা অন্যের দ্বারা লিখিত। এদেও অনেকেই প্রয়াত। কেউ কেউ বয়সজনিত কারণে লিখতে অপারগ। দুটি সংক্ষিপ্ত লেখা বুলবুল মহলানবীশ সংগৃহীত এবং বাকি ৩০টি লেখাই আত্মস্মৃতি। স্বরচিত। তিনজনের লেখা আছে ইংরেজিতে। ভিন্ন ভাষার কারণে এই তিনটি লেখা নিয়ে একটি বিভাগ করা হয়েছে, যা বইয়ের শেষ অংশে সন্নিবেশিত হয়েছে। এ তিনজন হচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা খাসিয়া নারী কাঁকন বিবি, এর সম্পর্ক লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সুরমা জাহিদ অপর দুজন হচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন ডা. সেতারা বীরপ্রতীক এবং একাত্তরের ২৫শে মার্চ পাকবাহিনির হাতে নিহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার কন্যা মেঘনা গুহঠাকুরতা। শেষোক্ত দুজনই আপন জবানীতে লিখেছেন। যাঁরা নিজের জবানীতে লিখেছেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন আছেন যাঁরা লেখালিখিতে অভ্যস্ত। বাকিরা নন। ফলে লিখতে অনভ্যস্ত মুক্তিযোদ্ধাগণ অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন রক্ত আর অশ্রুর কালিতে। এ গ্রন্থের বিয়াল্লিশটি লেখায় একাত্তরের নারীদেও কঠিন ভয়াবহ অকল্পনীয় বা দুঃসহ অভিজ্ঞতার খুব কম অংশই বর্ণিত হয়েছে। তবুও যতখানি আছে তা খাঁটি এবং আন্তরিক।

নারীর অভিজ্ঞতার বয়ানসমৃদ্ধ এ গ্রন্থে একটিই পুরুষ রচিত রচনা আছে। সে লেখাটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেরও ইতিহাস, যুদ্ধাপরাধীদেরও নানা তথ্য ও গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ। লিখেছেন 'সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ '৭১-এর মহাসচিব, বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবীব। তাঁর লেখাটি নিঃসন্দেহে বইটির মান বৃদ্ধি করেছে।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের অবিসংবাদিত গৌরবের ইতিহাস। এ ইতিহাসকে কখনোই মুছে ফেলা যাবে না, একে কখনও বিতর্কিতও করা যাবে না, বরং চর্চা ও গবেষণার মধ্য দিয়ে এই ইতিহাস কালে কালে আরও উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। এদেশের জনগণের অধিকার রক্ষা ও মুক্তির দাবিতে দীর্ঘকালের আন্দোলন সংগ্রামই একসময় রূপ পেয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে। একাত্তরে তিরিশ লক্ষ মানুষের রক্তনদী পেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এই আন্দোলন সংগ্রামে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, মুহম্মদ মনসুর আলী, মোহম্মদ কামারুজ্জামান, মেজর জিয়াউর রহমানসহ অনেক বীর সাহসী নেতার অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে। তাঁদের কথা কখনও ভোলা যাবে না। মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা স্বাধীন বাংলার স্থপতি অসীম সাহসী, দেশপ্রেমিক এবং মানবদরদী ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু এ দেশের নয়, সারাবিশ্বের এক শ্রেষ্ঠ নেতা হিসেবে স্বীকৃত। এ ইতিহাস আমাদের জাতীয় জীবনের শেকড়। এর ওপরই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে স্বাধীন বাংলার পতাকা। 'একাত্তরের দুর্নিবার নারী মুক্তিযোদ্ধা ও দুঃসহ স্মৃতি' বইটি এই গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের একটি আকর গ্রন্থ হিসেবে পাঠকের কাছে গৃহীত হবে এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।

পরিচিতি: কথাসাহিত্যিক, কবি, শিক্ষাবিদ। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা।