প্রবন্ধ ও নিবন্ধ

যৌথ প্রযোজনায় প্রতারণার কথকতা



ছটকু আহমেদ


হাঁটি হাঁটি পা পা করে স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ৫৪ বছর অতিক্রম করে ৫৫ বছরে পা দিয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় নির্মিত চাষি নজরুল ইসলাম পরিচালিত চলচ্চিত্র 'ওরা ১১ জন' দিয়ে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পেরিয়ে দীর্ঘ এই যাত্রাপথে আমরা ভারত তথা কলকাতার সাথে অনেক ছবি এককভাবে ও যৌথভাবে করেছি, তাতে আমাদের চলচ্চিত্র কিছুটা হলেও সমৃদ্ধ হয়েছে। '৭২ -এর ১৫ জুলাই ভারতের বিখ্যাত পরিচালক ঋত্বিক কুমার ঘটক বাংলাদেশে এসে নির্মাণ করেছেন "তিতাস একটি নদীর নাম", যা মুক্তি পেয়েছে ১৯৭৩ সালে, যে সিনেমা আজও বিশ্বের দশটি ক্লাসিক চলচ্চিত্রের অন্যতম বলে সমাদৃত। তিতাস ছিল সম্পূর্ণ বাংলাদেশের প্রযোজনায় একটি বাংলাদেশি ছবি।

আমি পূর্ব পাকিস্তানের কথায় যাব না, সে অনেক কাহিনি। আমি বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনা নিয়ে কথা বলব, যা শেষ অবধি প্রতারণায় গিয়ে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা অনেক দেশের সাথে যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ করেছি – পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ইরান, কানাডা, ফ্রান্স, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত। পাকিস্তান-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনা ছবি হয়েছে 'শক্তি' (১৯৮৪), 'আপোশ' (১৯৮৭),'ব্যবধান' (১৯৮৭), 'দুনিয়া' (১৯৮৮),'গুনাহ' (১৯৮৯), 'ঝড় তুফান'( ১৯৯৪), 'ফুল আউর পাত্থর' (২০০৪)। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও তুরস্কের যৌথ প্রযোজিত চলচ্চিত্র হয়েছে 'লাভার্স' (১৯৮৪)। শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র – 'মিস লঙ্কা' (১৯৮৫), 'সর্পরানী' (১৯৮৮)। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র 'হিমালয়ের বুকে' (১৯৮৬),'সাত সহেলি' (১৯৭৯), 'বলবান' (১৯৮৮), 'জীবন পরীক্ষা'( ১৯৯০), 'লেডি কমান্ডো' (১৯৯১)। বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের যৌথ অর্থায়নে প্রখ্যাত পরিচালক তারেক মাসুদ ছবি করেছেন 'মাটির ময়না' (২০০২)। মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় 'দ্য স্পিড' (২০১২)। আফগানিস্তান-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় আফগান নারী নির্মাতা ডায়ানা সায়েব জামাল ছবি করেছেন 'রোকায়া' (২০১৯)। ইরানের সাথে যৌথ প্রযোজনায় ছবি করেছে। নায়ক প্রযোজক অনন্ত জলিল 'দিন দা ডে'(২০২২), নায়ক প্রযোজক সুমন ফারুক করেছেন – 'ফেরেশতা' (২০২৪)। মার্কিন-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র – 'নো ল্যান্ডস ম্যান'। বাংলাদেশ, ফ্রান্স, জার্মানি, নরওয়ে ও পর্তুগালের জয়েন্ট প্রডাকশনে নির্মিত হয়েছে – 'দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড'। গ্রিস-ফ্রান্স-জার্মানি ও বাংলাদেশের উদ্যোগে মাইটি আফরিন নির্মাণ করেছেন: 'ইন দ্য টাইম অব ফ্লাডস'। আর সবচেয়ে বেশি যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মিত হয়েছে ভারতের সাথে। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭৩ সালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে আলমগীর কবির পরিচালিত 'ধীরে বহে মেঘনা'। এরপর অম্বরীশ সাঙ্গাল ও এহতেশাম পরিচালিত 'দূরদেশ' (১৯৮৩), ১৯৮৫-তে শক্তি সামন্ত পরিচালিত 'অবিচার', প্রমোদ চক্রবর্তী পরিচালিত 'বিরোধ' (১৯৮৬)। গৌতম ঘোষ পরিচালিত 'পদ্মা নদীর মাঝি' (১৯৯৩), 'মনের মানুষ'(২০১০),'শঙ্খচিল' (২০১৬), বাসু চ্যটার্জি পরিচালিত 'হঠাৎ বৃষ্টি' (১৯৯৮), মতিউর রহমান পানু পরিচালিত 'মনের মাঝে তুমি' (২০০৩),মনোয়ার খোকন পরিচালিত 'স্বামী কেন আসামী' (১৯৯৭), প্রসেনজিৎ পরিচালিত 'আমি সেই মেয়ে'( ১৯৯৮), তমিজ উদ্দিন রিজভী পরিচালিত 'জবাবদিহি' (১৯৯৯), ছটকু আহমেদ পরিচালিত 'শেষযুদ্ধ' ( কলকাতায় নাম- 'এরই নাম ভালোবাসা') (২০০২), হরনাথ চক্রবর্তী ও আজিজুর রহমান বুলি পরিচালিত 'রাজা রানী বাদশা'( ২০০৯), অনন্য মামুন পরিচালিত 'আমি শুধু চেয়েছি তোমায়' (২০১৪), জয়দীপ মুখার্জি পরিচালিত 'শিকারী' (২০১৬), 'নবাব' (২০১৭) ,মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী পরিচালিত 'ডুব' (২০১৭), অনন্য মামুন ও জয়দীপ মুখার্জি পরিচালিত 'তুই শুধু আমার' (২০১৮), 'দরদ' (২০২৪) এবং গোবিন্দ নিহালিনী পরিচালিত 'মুজিব: একটি জাতির রূপকার' (২০২৩)।

আরো অনেক ছোটোবড়ো ছবি হয়েছে। আমরা যৌথ প্রযোজনার ছবি শুরু করি ১৯৮৫ সালে। বিশিষ্ট অভিনেতা সৈয়দ হাসান ইমাম- এর প্রযোজনায় মিঠুন চক্রবর্তী, রোজিনা ও উৎপল দত্তকে কাস্টিংয়ে রেখে বম্বের প্রখ্যাত পরিচালক শক্তি সামন্তের পরিচালনায় 'অবিচার' চলচ্চিত্র, যা কলকাতায় মুক্তি পেয়েছিল 'অন্যায় অবিচার' নাম দিয়ে। বাঙালি মিঠুনের বাংলাদেশে প্রথম ছবি দারুণ ব্যবসায়িক সফল্য পায়। তারপর শুরু করলেন 'তিতাস একটি নদীর নাম'-এর প্রডিউসার হাবিবুর রহমান খান। তিনি ভারতের 'শত্রু' ছবিটা রাজেশ খান্নাসহ নিয়ে এলেন। আমাদের দেশের সুন্দরী নায়িকা শাবানাকে নিয়ে সেই ছবিটি 'বিরোধ' নামে মুক্তি পেয়ে দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়। পরিচালনা করলেন বোম্বাইয়ের প্রখ্যাত আরেক বাঙালি পরিচালক প্রমোদ চক্রবর্তী। এরপর আমাদের সাথে পরিচয় হলো কলকাতার একজন বিখ্যাত প্রযোজক পরিবেশক বিজয় খেমকা সাহেবের সাথে। তিনি আমাদের এখানে কিছু মুক্তিপ্রাপ্ত সুপারহিট ছবি কলকাতায় রিমেক করলেন। যেমন 'বেদের মেয়ে জোস্না', 'মায়ের আশীর্বাদ', 'মনের মাঝে তুমি', 'সত্য মিথ্যা'।

আমার কলকাতা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি দর্শন শুরু হলো সেই থেকে। এর আগে ১৯৯৩ সালে কলকাতায় উষা উত্থুপের স্টুডিয়ো ভাইব্রেশনে হৈমন্তী শুক্লা ও কুমার বিশ্বজিৎকে দিয়ে আমার 'মায়ামমতা' ছবির গান রেকর্ড করেছিলাম। 'সত্যমিথ্যা' ছবিতে কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হলো 'এই রাত তোমার আমার' গান খ্যাত 'হসপিটাল' ছবির নায়ক বসন্ত চৌধুরীর সঙ্গে। তাঁর অভিনয় নৈপুণ্যের কথা শুনেছিলাম, কিন্তু তাঁর মানবিক গুণের পরিচয় পেলাম শুটিংয়ের সেটে। স্ক্রিপ্ট থেকে দৃশ্য পড়াবার সময় তিনি গল্প করে জেনে নিলেন আমার মেজ মেয়ে স্থীরার গলায় প্রবলেম। তিনি তখন নিজে বল্লেন, নেক্সট লটের শুটিংয়ের সময় কাগজপত্র নিয়ে মেয়েকে নিয়ে চলে এসো। এখানে উপমহাদেশের বিখ্যাত নাক কান গলার একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আছেন আবীরলাল মুখোপাধ্যায়। তাঁকে দেখিয়ে নিয়ে যাও উপকার পাবে। পরের লটে মেয়ে নিয়ে এলাম। অ্যাপয়েন্টমেন্ট থেকে শুরু করে সব তিনি করে দিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ করলেন। যাক সেটা পারিবারিক কথা, ছবির কথায় আসি। বসন্তদা আর মহানায়ক উত্তমকুমারের 'মায়ামৃগে'র 'ও বাক বাক বাক বাকুম বাকুম পায়রা' গানের নায়িকা সন্ধ্যা রায়কে নিয়ে রাত দিনে খেটে 'সত্যমিথ্যা' ছবির শুটিং শেষ করলাম। এই ছবির শুটিংকালে 'মনময়ূরী' খ্যাত পরিচালক বীরেশ চ্যাটার্জি এলেন। আমাকে দিয়ে একটা স্ক্রিপ্ট লেখাবার সিডিউল নিয়ে আলাপ করতে। এছাড়াও এলেন বিখ্যাত প্রযোজক পরিবেশক শম্ভু ধানুকা। আমাদের কলকাতার বন্ধু জয়ন্তের সাথে আরও অনেকে এসেছেন আমার কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার নিবাস এস্টোরিয়া হোটেলে । এর মধ্যে বড়ো মাপের একজন প্রযোজক-পরিবেশক এলেন, ড্রাইভারের হাতে ছিল দুটো দামি মদের বোতল। তিনি বললেন, বাংলাদেশে এরই মধ্যে আপনি দেড়শোর উপর সিনেমার গল্প লিখে ফেলেছেন, আপনার গল্পের প্রায় ছবিই সুপার হিট। এরপর মদের বোতল দুটো দেখিয়ে ব্যান্ডের খুব প্রশংসা করে বললেন, গল্প শুনব আর দু'জনে খাব। আমি বললাম, দাদা আমিতো মদ খাই না। তিনি ঝটকা খেলেন, সিনেমায় কাজ করি মদ খাই না শুনে। এই প্রসঙ্গটা বললাম এইজন্যে যে, তারপর আমি যখন বললাম, আপনি খেতে খেতে শুনুন, আমার কোনো অসুবিধা হবে না, আমাদের ওখানেও অনেক খেতে খেতে শোনে – আমার এই ধরনের অসংখ্য পীড়াপীড়িতে না টলে তিনি অসম্ভব সৌজন্য দেখিয়ে মদের বোতল তাঁর ড্রাইভারকে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, আপনি যখন খাবেন না আমিও খাব না, শুধু গল্প শুনব। আমি মুগ্ধ হলাম।

এইরকম অবস্থা আমার আরও বিভিন্ন যায়গায় হয়েছিল। বাংলাদেশে আমার সুপার ডুপার হিট ছবি 'সত্যের মৃত্যু নেই' কলকাতা দ্বিতীয় ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশ থেকে সরকারিভাবে মনোনীত হয়ে এসেছে, সেই সাথে আমিও ডেলিগেট হয়ে এসেছি। ওয়েস্ট বেঙ্গল আর্টিস্ট ফোরাম আমাদের নেমতন্ন করেছে । সেখানে গিয়েও দেখি মদের ছড়াছড়ি। আমি মদ খাইনা শোনার পর আমার জন্যে তাদের সফট ড্রিংকস আনার ছুটাছুটি দেখে আমি অনুভব করেছিলাম, মদ না খাওয়াটাও একটা বিড়ম্বনা। এরপর কলকাতার বিএফজেএ সম্পাদক নির্মল ধর যখন পিয়ারলেস ইন-এ নেমতন্ন করলেন তখন গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল থেকে পিয়ারলেস যাওয়ার সময় চুপিচুপি থামসআপ-এর বোতল ব্যাগে নিয়ে গেছি।

১২ নভেম্বর '৯৬ নন্দনের আধিকারিক অংশ শূর-এর সভাপতিত্বে মুখ্যমন্ত্রী জ্যেতি বসুর উদ্‌বোধন করা এই ফেস্টিভ্যালে আমাদের সাথে বিশিষ্ট অভিনেতা নানা পাটকের সহ বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার বাসু ভট্টাচার্য, গোবিন্দ নিহালিনী উপস্থিত ছিলেন। উৎসবে হাঙ্গেরির ছবি 'গডস ওয়াক ব্যাকওয়ার্ড', অপর্ণা সেন পরিচালিত 'যুগান্তর', অসমিয়া ছবি 'অন্যায্য' এর সাথে আমার পরিচালিত ছবি 'সত্যের মৃত্যু নেই' ও আমার লেখা কাহিনি অবলম্বনে 'সংসারের সুখদুঃখ' ছবির কয়েকটা শো হয়েছে নন্দন-১, শিশির মঞ্চে ও রবীন্দ্র সদনে। জ্যোতি বসুর সাথে শুধু হাত মেলানো হয়েছে, আর সবার সাথে কথা হয়েছে বিশেষ করে অসাধারণ অভিনয় শিল্পী নানা পাটেকর সাহেবের সঙ্গে। হাত বাড়ানো সাথে কুশল জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তখনো তাঁর দেখা হয়নি কিন্তু শুনেছেন। অঙ্কুশ, পরিন্দা, অঙ্গার, ক্রান্তিবীর-এর মতো অসাধারণ ছবির অভিনেতাকে সামনে থেকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। (এই লেখাটা লেখার সময় খবর পেলাম ৮ অক্টোবর তিনি প্রয়াত হয়েছেন। আমি তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।)

এই ফেস্টিভ্যালেই ছবি দেখে বিজয় খেমকা বললেন, 'সত্যের মৃত্যু নেই' কলকাতায় রিমেক করবেন। এবং এর কিছু দিন পর তিনি জানালেন, তাঁর সাথে প্রযোজক হিসেবে থাকবেন কলকাতার বিখ্যাত প্রযোজক-পরিবেশক আর ডি বনশাল। আমি যখন সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখতাম তখন থেকে তাঁর নামের সঙ্গে আমি পরিচিত। কলকাতায় গেলাম, অসম্ভব অমায়িক ভদ্রলোক বনশাল সাহেবের বাসায় কয়েকদিন সিটিং হলো, গল্প বাজেট শোনার সাথে সাথে লাঞ্চ ডিনার হলো, তিনি রাজি হলেন, কিন্তু ছবির বাংলাদেশের প্রযোজকের আপত্তিতে তা আর কলকাতার পর্দায় মুখ দেখেনি। তার ধারণা কলকাতায় ছবি রিলিজ হলে অর্ন্তজাতিকভাবে তাঁর ছবিটা পাইরেসি হয়ে যাবে। এরই মধ্যে কলকাতার আর এক প্রযোজক সঙ্গীতা মুভিজের সঙ্গীতা জৈন আমার আর এক গল্প 'জবাবদিহি' শুনে যৌথ প্রযোজনায় ছবি নির্মাণ করতে এগিয়ে এলেন। শুরু হয়ে গেল কলকাতায় জবাবদিহি ছবির শুটিং। আমাদের দেশের পরিচালক তমিজউদ্দিন রিজভী, কলকাতার বিশিষ্ট অভিনেতা বিপ্লব চ্যাটার্জির সাথে ছিলেন মুম্বাইয়ের সুন্দরী নায়িকা মনিকা বেদি, আর আমাদের দেশের জননন্দিত অভিনেত্রী শাবানা ও 'হঠাৎ বৃষ্টি' খ্যাত নায়ক ফেরদৌস এবং প্রখ্যাত খলনায়ক মিশা সওদাগর। আমরা দিন রাত কাজ করলাম কলকাতায় বিখ্যাত টেকনিশিয়ান স্টুডিয়ো, ইন্দ্রপুরি স্টুডিয়ো এবং কলকাতার বিভিন্ন স্থানে। 'জবাবদিহি' ছবির কাজ দেখেই হোক বা গল্প শুনেই হোক সেম প্রডিউসার এবার ডাইরেক্ট আমার সাথে যৌথ প্রযোজনায় ছবি করতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন। পরেশ পারেখ পিকচার্স ও সঙ্গীতা মুভিজ-এর সাথে আমার বাংলাদেশের এম এম মুভিজ। আমরা যথারীতি পেপারস রেডি করে শুটিং শুরু করলাম 'শেষ যুদ্ধ'। কলকাতায় ছবি রিলিজের সময় 'শেষ যুদ্ধ' নামটা কলকাতার প্রডিউসারের খুব জুতসই মনে হয়নি, তাই একটা অ্যাকশন বেসড গল্পের ছবির নাম বদলে তিনি দিলেন রোমান্টিক নাম – 'এরই নাম ভালোবাসা'। 'শেষ যুদ্ধ' ছবির শুটিং করেছিলাম দার্জিলিং, পেলিং, কলকাতার ওয়াটার থিম পার্ক অ্যাকুয়াটিকা, পামভিলেজ, নিকো পার্ক, রেসকোর্স ও সল্টলেকে। অভিনয় করেছিলেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, মহিমা চৌধুরী,বিপ্লব চ্যাটার্জি, দোলন রায়, সংঘমিত্রা, অনামিকা দাস , সুনীল মুখার্জির মতো কলকাতার নামকরা শিল্পীর সাথে আমাদের দেশেরও প্রথিতযশা সব শিল্পী – নায়ক মান্না, অমিত হাসান, নায়িকা শাবনুর, খলনায়ক এটি এম শামসুজ্জামান, রাজীব ও মিশা সওদাগর। সে এক সাড়া জাগানো ব্যাপার। এক দেশের বড়ো বড়ো সব শিল্পী নিয়ে আর এক দেশে শুটিং করছি, সাথে ইউনিটের বিরাট লটবহর। এক লট দার্জিলিং, এক লট পেলিংয়ে, এক লট কলকাতা, একলট ঢাকা। এই ছবির শুটিং লোকেশন ছিল অসাধারণ সুন্দর, আর গান ছিল ছবির প্রাণ। প্রখ্যাত বাঙালি সুরকার বাবুল বোস-এর সুরে বোম্বাইতে রেকর্ড করা এই ছবির গানের শিল্পীরা ছিলেন কুমার শানু, অনুরাধা পড়োয়াল, অভিজিৎ, বাবুল সুপ্রিয়, সুনিধি চৌহান, সাধনা সরগম, হেমা সরদেশাই, জলি মুখার্জিসহ আরো অনেকে। বোম্বাইতে গান করে ভালো লাগায় আমার পরের অনেক ছবি গান করেছি সেখানে। এমনও হয়েছে ঢাকা থেকে সুর করে এনে কলকাতায় কিংবদন্তি গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে লিখিয়ে মিউজিক অ্যারেঞ্জার রকেট মণ্ডলকে দিয়ে মিউজিক করে বোম্বাইতে গিয়ে গায়ক-গায়িকা আশা ভোঁসলে, উদিত নারায়ণ, শ্রেয়া ঘোষাল-এর ভয়েস টেক করেছি। আমার 'শেষযুদ্ধ' ছবির পর যৌথ প্রযোজনার ছবির দিকে অনেকে ঝুঁকে পড়লেন। আমাদের দেশের বিখ্যাত প্রডিউসার বশীরুল হক যৌথ প্রযোজানয় ছবি করতে আমাকে নিয়ে উড়ে গেলেন বোম্বাই। নায়িকা রানি মুখার্জির বাবা সমু মুখার্জি ও বোম্বাইয়ের বিখ্যাত পরিবেশক লালা দামিনিকে আমি গল্প শুনালাম। তাঁদের খুব পছন্দ হলো, বললেন, আপনার গল্পের যত প্রশংসা করি তা কম হয়ে যাবে। আমি খুশিতে কথাটা রেকর্ড করে রাখলাম, কিন্তু খুশিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। বাজেট করতে গিয়ে তাঁদের বিশাল বাজেটের সাথে আমাদের প্রডিউসারের এফর্ডেবল টাকা তাঁদের কাছে নস্যির মতো লাগলো। তাঁরা ফিফটি হিসেবে যে টাকার কথা বলেছিলেন সেটা আমার প্রডিউসার বশীরুল হক সাহেবের সামর্থ্যের মধ্যে ছিল না। আর এই অসমর্থতা থেকেই পরবর্তীকালে শুরু হলো যৌথ প্রযোজনার নামে যৌথ প্রতারণা। যৌথ প্রযোজনায় অনেক নিয়ম নীতি মানা হতো, যেমন স্ক্রিপ্ট দুই মন্ত্রাণালয় থেকে পাশ করাতে হবে। আমাদের ঢাকায় সহজ ছিল, কিন্তু ভারতে অ্যাম্বাসির থ্রুতে দিল্লি পাঠিয়ে পাশ করাতে হবে। সে না হয় ধরনা দিয়ে করানো গেল, কিন্তু সেখানেও শর্ত। আপনার শুটিং চলাকালীন মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি থাকবেন, তিনি শুটিং দেখবেন। আবার এডিটিং চূড়ান্ত করা হলে তিনি ছবি দেখবেন। তাঁর অনুমোদন ছাড়া ছবি রিলিজ করা যাবে না। কেন রে বাবা সেন্সার বোর্ডতো আছে সেতো দেখবে, কিন্তু না, তা হবে না। সুতরাং সেই প্রতিনিধিকে ম্যানেজ করে রাখুন। আমি যখন পেলিং থেকে শুটিং করে দার্জিলিং যাচ্ছি তখন চেক পোস্টে আমার শুটিং করা নেগেটিভ পারলে বের করে দেখবে, পরে তাদের বোঝানো হলে নেগেটিভ বের করলে শুটিংয়ের কোনো ছবি থাকবে না। আলোতে নষ্ট হয়ে যাবে। সেই বোঝানোর সাথে কিছু মশলাও দিতে হলো। তারপর ছাড় পেলাম। যৌথ প্রযোজনার নিয়ম কানুন দিন দিন সহজ না করে কঠোর করা হলো, আর এই কঠোরতাকে অবৈধভাবে সহজ করতেই একদল প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া শুরু করলো। যৌথ প্রযোজনার নিয়ম নীতি যথা – দুই দেশের সমান শিল্পী, কলাকুশলী, দুই দেশে সম পর্যায়ে শুটিং – এইসব নিয়মকে ভেঙে সম্পূর্ণ ছবি ভারতে বানিয়ে এখনকার শিল্পী টেকনিশিয়ানদের দিয়ে প্রধান প্রধান কাজ করিয়ে এক-দুইজন বাংলাদেশি শিল্পী কাস্ট করে তকমা এঁটে দেওয়া শুরু হলো যৌথ প্রযোজনার। টাকার জোরে নিয়ম কানুন ভাঙা ও তছনছ করা হলো, আর সেই প্রতারণার ছবি আমাদের দেশে মুক্তি পেতেই ফুঁসে উঠলেন আমাদের শিল্পী টেকনিশিয়ানরা।

নিয়ম মান্যকারীর দলের সাথে নিয়ম অমান্যকারী দলের সংঘর্ষ হতে থাকলো । সুশীল সমাজ থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠলো, মানববন্ধন করলো আমাদের শিল্পী কলাকুশলীরা। ব্যস, যৌথ প্রযোজনার অপার সম্ভবনার দুয়ার বন্ধ হয়ে গেল। দুই দেশের কিছু বেনিয়া ব্যবসায়ীদের লোভের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল সব সম্ভাবনা।

বাংলাদেশ-ভারত যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র কেবল দুটি দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বাণিজ্যিক আদান-প্রদান নয়, বরং এটি দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন। যৌথ প্রযোজনা একদিকে যেমন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কারিগরি মান ও বাজেটের সীমাবদ্ধতা দূর করতে সাহায্য করেছে, অন্যদিকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্যও বাংলাদেশের বিশাল দর্শক বাজার উন্মোচন করেছে। এই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা যদি সততা, মেধার সঠিক মূল্যায়ন এবং উভয় দেশের সমান অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বজায় থাকে, তবে ভবিষ্যতে বাংলা চলচ্চিত্র বিশ্বমঞ্চে নিজস্ব ও শক্তিশালী একটি জায়গা করে নিতে সক্ষম হবে।

আমার মতে ছবি বানাতে কোনো নিয়ম কানুনের বাধার দরকার নেই। যার যেখানে খুশি ছবি বানাক, যাকে ইচ্ছা তাকে নিয়ে ছবি বানাক, যে দেশে ইচ্ছা শুটিং করুক, কোনো সরকারি বাধা থাকা ঠিক না। এখন প্রযুক্তির যুগ, যেখানে প্রযুক্তি সহজলভ্য হবে সেখানে মানুষ ছুটবে। আপনি চলচ্চিত্রের স্বার্থে যেখানে ভালো প্রযুক্তিবিদ পাবেন সে দেশের হোক আর বিদেশের হোক, সেখান থেকে নেবেন। আর তখন আপনার দেশের কলাকুশলীরা সেই রকম ভালো প্রযুক্তিবিদ হতে চাইবে। কমপিটিশনে পড়লেই জ্ঞান বাড়বে। মানুষ কোনো তেল, গ্যাস বা বিদ্যুৎ না যে ভরতুকি দিয়ে চালাবেন। মানুষের যোগ্যতার আয় দিয়ে দেশ চলবে। দেশের শিল্পী কলাকুশলীদের সুরক্ষার দিকে শুধু না তাকিয়ে তাঁদের টেকনিক্যাল ক্ষমতা ও অভিনয় নৈপুণ্যতা বাড়ানো প্রয়োজন। আর যোগ্যতা বাড়ালে গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে।

সংস্কৃতি বিকাশে কোনো দেশের সীমারেখার কাঁটাতার না দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতার চিন্তাধারার স্বাধীনতাই প্রধান হওয়া উচিত।

পরিচিতি: তাঁর পিতৃদত্ত নাম সৈয়দউদ্দিন আহমেদ। চলচ্চিত্র জগতে তিনি ছটকু আহমেদ নামে পরিচিত। তিনি বাংলাদেশের মূল ধারার বাণিজ্যিক ছবির অন্যতম পরিচালক, কাহিনিকার, সংলাপ রচয়িতা, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক ও পরিবেশক। কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালক ঋত্বিক ঘটকের অমর সৃষ্টি 'তিতাস একটি নদীর নাম' ছায়াছবিতে সহকারী পরিচালক হিসাবে তাঁর চলচ্চিত্র জগতে আত্মপ্রকাশ। তিনি এ পর্যন্ত ১৬টি পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। সব মিলিয়ে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রায় ৩০০টি ছায়াছবির জন্য তিনি কাহিনি, চিত্রনাট্য এবং সংলাপ রচনা করেছেন। চলচ্চিত্র শিল্পে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য তিনি 'জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার' সহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। তিনি ঢাকায় (বাংলাদেশ) বসবাস করেন।