[বহুমাত্রিক সৃজন প্রতিভায় ঋদ্ধ অনন্য শিল্পী ভূপেন হাজারিকার সৃষ্টির অভিযাত্রায় লেখালেখির দক্ষতা ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকা সম্পাদনার দিকটিও উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। তিনি তাঁর শিল্পী-জীবনের বিভিন্ন পর্বে 'জয়ন্তী', 'আবাহন', 'গতি' এবং সর্বশেষ বিখ্যাত পত্রিকা 'আমার প্রতিনিধি'র সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিলেন। ১৯৫৫-৫৬ সালে কলকাতা আসার পর সংগীত-জীবনের বিপুল ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি 'গতি' এবং 'আমার প্রতিনিধি' ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে গেছেন। এই সবক'টি পত্রিকাই ছিল অসমিয়া ভাষায়। বিশেষ করে ১৯৬০ সালে প্রকাশিত 'আমার প্রতিনিধি' পত্রিকাটি পাঠক সমাজে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছিল। ভূপেন হাজারিকা এই পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্যান্য কলামের সঙ্গে 'শিল্পীর পৃথিবী' শিরোনামে নামে একটি অনবদ্য কলাম সংযোজন করেন, যা তিনি নিজে পরিচালনা করতেন। এই কলামে তিনি সাংস্কৃতিক জগতের নানা সংবাদ অত্যন্ত চমৎকার আঙ্গিকে তুলে ধরতেন। পাঠকদের কাছে এই কলামটি ছিল পত্রিকার অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে আসার কিছুদিন পর তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়, উত্তমকুমার, সৌমিত্র চ্যাটার্জি, ভূপেন হাজারিকা এবং ওডিশার প্রতিনিধি ধীরু বিশোয়াল । উপলক্ষ ছিল সেই সময়ে টালিগঞ্জ স্টুডিয়ো পাড়ায় লোডশেডিংয়ের ফলে সিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে যে সমস্যা দেখা দিয়েছে তার সমাধানের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানানো।
সেদিন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে তাঁদের মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল, তা সুন্দরভাবে লিপিবদ্ধ করেছিলেন ভূপেন হাজারিকা 'আমার প্রতিনিধি'র 'শিল্পীর পৃথিবী' কলামে "মই দেখা কথা... এইমাত্র মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুৰ সৈতে আমাৰ আলোচনা হৈ গল..." শিরোনামে, ১৮ বছর, ১১শ সংখ্যা, সেপ্টেম্বর, ১৯৭৮ সংখ্যায়। সেই লেখার পূর্ণ বঙ্গানুবাদ এখানে তুলে ধরা হলো।]
এইমাত্র মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়ে গেল...
'সত্যজিৎ রায়, উত্তম কুমার, সৌমিত্র চ্যাটার্জি, ভূপেন হাজারিকা (পূর্ব ভারতের হয়ে) এবং ধীরু বিশোয়াল (উড়িষ্যার হয়ে) - এই পাঁচজনের প্রতিনিধি দলকে ১০ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে আলোচনা এবং দাবি জানাতে পাঠানো হোক।' প্রস্তাব করল ৭ আগস্টের সভায় স্টুডিয়োতে - কলকাতার ফিল্ম টেকনিশিয়ানের উত্তেজনাপূর্ণ সভায়। উদ্দেশ্য স্টুডিয়োতে লোডশেডিং বন্ধ করুন। আমাদের আলো প্রয়োজন।
১০ আগস্ট '৭৮, বেলা তিনটে বেজেছে। রাইটার্স বিল্ডিং।
আমরা পাঁচজন যথাসময়ে সত্যজিৎ রায়ের ঘরে একসঙ্গে হলাম। একটি গাড়িতে সত্যজিৎ, উত্তম এবং ধীরুবাবু । অন্য একটিতে সৌমিত্র এবং আমি।
ঠিক তিনটের সময় পুলিশ সাদরে আমাদের জ্যোতি বসুর কক্ষে নিয়ে গেলেন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুন্দর কক্ষ। পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যুৎ বিভাগের উচ্চতম কর্মকর্তা এবং ইঞ্জিনিয়ারদেরকে আগেই ডেকে রেখেছেন জ্যোতিবাবু। প্রায় ১০ জন মতো প্রেস ফটোগ্রাফার হুড়মুড় করে করে ঢুকে ক্লিক ক্লিক করলেন।
- আমরা জ্যোতিবাবুকে নমস্কার জানালাম। জ্যোতি বসু দাঁড়িয়ে আমাদের প্রত্যেকের দু'হাত ধরে ধরে প্রতি নমস্কার জানিয়ে বসতে বললেন।
চিত্র সাংবাদিকরা চলে গেলেন। হেসে হেসে জ্যোতিবাবু তখন সত্যজিৎবাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন - আপনার অসুখ হয়েছিল যে, কেমন আছেন? সত্যজিৎবাবুও হেসে বললেন: আমার তিনবার ম্যালেরিয়া হলো। (কলকাতায় এত জল জমে যে মশা হয়! এই মহানগরীতেও তাই ম্যালেরিয়া হয়।) উত্তমকে জ্যোতিবাবু জিজ্ঞাসা করলেন - আপনারও কি যেন একটা অসুখ হয়েছিল! সুদর্শন উত্তমকুমার বললেন - আমি একেবারে ঠিক আছি। আমার দিকে তাকিয়ে জ্যোতিবাবু বললেন - 'আপনি আজকাল কলকাতাতেই বেশি থাকেন। আপনার গান এখানকার রেডিয়োতে প্রায়ই শুনি।' (এক সময়ে জ্যোতিবাবুর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল। তাঁর প্রিয় গান ছিল 'সাগর সঙ্গমে'।) সৌমিত্রর দিকে তাকিয়ে বললেন - 'আপনি আজকাল আগের ঠিকানায় থাকেন না তাইনা?' সৌমিত্র বললেন, 'হ্যাঁ, আমি ঘর পালটেছি'। উড়িষ্যার প্রযোজক ধীরু বিশোয়ালকে জ্যোতিবাবু বললেন, 'স্টুডিয়োতে বিদ্যুতের সরবরাহের জন্য আপনারা এসেছেন। ওদিকে আপনাদের উড়িষ্যা থেকে আমরা বিদ্যুৎ শক্তি আনতে চাইছি। পেলে খুব ভালো হয়।'
আমরা গিয়েছিলাম টালিগঞ্জের চারটা স্টুডিয়োতে (১৪টার মধ্যে আটটা বন্ধ হয়ে গেছে) নিয়মিত লোডশেডিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে। শুটিংয়ের সময়ে, রেকর্ডিংয়ের সময়ে যখন তখন অন্ধকার হয়ে যায়। ২ ঘণ্টা থেকে ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যায়। টালিগঞ্জে শুধু বাংলা ছবিই নয়, উড়িষ্যা, বিহার, মণিপুর, অসমের আঞ্চলিক ভাষারও ছবি তৈরি হয়। কলকাতার বাইরের প্রযোজকদের শিল্পীদের কলকাতা এনে হোটেলে রাখতে হয়। একমাসের কাজে দু'মাস লাগে। খরচ বেড়ে যায়। অর্থ দেওয়া প্রযোজকরা ভয় পেয়ে যায়। উড়িষ্যার প্রায় ২৩টি ছবির মধ্যে ১৮টি এই বছর টালিগঞ্জে না এসে মাদ্রাজে চলে গেছে। টালিগঞ্জের অবস্থা খুব খারাপ হয়েছে। কলকাতার কলাকুশলীদের 'রোজগারে' সরাসরি প্রভাব ফেলছে এই লোডশেডিং। আমরা সবাই এই সমস্ত কথা বলার পরে জ্যোতিবাবু জানতে চাইলেন,এখন সমাধান কি চাইছেন?
আমরা প্রস্তাবাকারে নিয়ে গেছিলাম দুটো সমাধান। হয় আমাদের টালিগঞ্জের টেলিভিশন স্টুডিয়ো থেকে স্থায়ী লাইন একটা দিন অবিরাম বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য। কিংবা সপ্তাহে অন্তত চার দিন স্টুডিয়োগুলিতে এবং চারটি ল্যাবোরেটোরিতে। বিদ্যুৎ বিভাগের সেক্রেটারি মুরশেদ সাহেব বললেন,প্রথমটির জন্য বারো লক্ষ টাকা লাগবে। জ্যোতিবাবু সক্ষম শাসকের মতো তাঁকে বললেন: মুরশেদ সাহেব, এই সমস্যার বিশ্লেষণ করবেন না। সমাধান কি দিতে পারেন সেটাই বলুন। আমি সোজাসাপটা বললাম: 'জ্যোতিবাবু আপনারা পশ্চিমবঙ্গে বড়ো বড়ো ছবি করতে অনুদান দিচ্ছেন অনেক। তরুণ মজুমদারকে 'গণদেবতা'র জন্য তেরো লক্ষ,উৎপল দত্তকে ১১ লক্ষ 'ঝড়' ছবির জন্য এবং মৃণাল সেনকে ১০ লক্ষ 'পরশুরামে'র জন্য। অন্যান্য ছবির সঙ্গে সেইগুলোর কাজও বন্ধ হয়ে থাকে। এসব কথা ভাবলে ১২ লক্ষ টাকা কি বড্ড বেশি? এই টাকায় একটি স্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে যায়।
জ্যোতিবাবু সুন্দর উত্তর দিলেন,১২ লক্ষ টাকা অবশ্য কিছুই নয়। সেটা এমুহূর্তে না করে, আপনাদের দ্বিতীয় প্রস্তাবটি কার্যকরী করতে পারি কিনা বলে মুরশেদের দিকে তাকালেন। মুরশেদ তাঁর সহ অফিসারদের সঙ্গে আলোচনা করে বললেন, আমরা সপ্তাহে তিন দিন ১২ ঘণ্টা করে অবিরাম বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করে দেব। আমরা বললাম, চারদিন দিন। তিনি বললেন, তিন দিন এই মুহূর্তে দেব। চতুর্থ দিনের কথাটি আপনাদের দুই এক দিনের মধ্যে বলব। তখন জ্যোতিবাবু জানতে চাইলেন, 'সপ্তাহের কোন তিন দিন বা চার দিন আপনাদের বিদ্যুতের গ্যারান্টি দরকার? সৌমিত্র বললেন: কলকাতায় মঞ্চের শিল্পীরা সবাই বৃহস্পতি, শনি এবং রবিবার ব্যস্ত থাকেন। স্টুডিয়োতে শুটিংয়ের জন্য আসা বন্ধ থাকে। সেজন্য সোম, মঙ্গল, বুধ এবং শুক্রবার তাই আমাদের বিদ্যুৎ প্রয়োজন।
মুরশেদ কথাগুলো নোট করে নিলেন। এই সময়ে গরম গরম চা এলো। আমরা বললাম, 'oriented industry' - এই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, তাই বামফ্রন্ট সরকারের কাছ থেকে আমরা সহযোগিতা স্বাভাবিকভাবেই আশা করি।
জ্যোতিবাবু হেসে বললেন, 'আমরা সে বিষয়ে সজাগ। তিন দিন পাবেনই। এর বাইরেও আরো কতটা করতে পারব, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির বিষয়ে,আমরা আপনাদের জানাব।'
জ্যোতিবাবুর আন্তরিকতা, ভদ্রতা, দৃঢ়তা, আতিথ্য এবং তিন দিন বিদ্যুৎ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে যখন বেরিয়ে আসছি - তখন রাইটার্স বিল্ডিংয়ের প্রায় সব সরকারি কর্মচারী এমনকাণ্ড করলেন যে উত্তম বলে উঠলেন: ওরে বাপরে, এখানেও এত ক্রাউড! সত্যজিৎবাবু চিন্তিত হলেন। মন্ত্রী যতীন চক্রবর্তী দু'হাত মেলে ধরে (পুলিশের সাথে সাথে) আমাদের একটি সরু কক্ষে নিয়ে গেলেন। সেখানে দেখি অনেক সাংবাদিক। আমাদের মুখ্যমন্ত্রী কী বললেন? কী প্রতিশ্রুতি দিলেন? ইত্যাদি । আমরা বললাম।
আমরা আমাদের গাড়ি দুটি মানুষের ভিড়ের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কোথায় আছে আমাদের গাড়ি দুটি। উপায় না পেয়ে মাইক্রোফোনে পুলিশ ঘোষণা করলে গাড়ি দুটো পেলাম। কিন্তু এত মানুষ! মজার কথা হলো একজন মহিলা সরকারি কর্মচারী উত্তমকুমারের পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন! উত্তমকুমার হেসে ফেললেন। সৌমিত্রকে একজন বললেন, 'দেবদাস দাদা!' (সৌমিত্র 'দেবদাস' ছবিতে নায়ক হয়েছেন, উত্তমকুমার হয়েছেন চুনীলাল) একজন আমার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললেন,'ভূপেনদা, গঙ্গা আমার মা টা গেয়ে যান না!' অতি লম্বা সত্যজিৎবাবু দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে বসে পড়লেন। আমাদের দুটো গাড়ি চলতে শুরু করলো। আমরা খুশি মনে যখন টালিগঞ্জ পেলাম আমাদের অন্যান্য টেকনিশিয়ানরা বললেন,'সাবাস'। আমরা বললাম, দাঁড়ান, করার মতো আরও অনেক কিছু রয়েছে।
[বঙ্গানুবাদ: সন্দীপ দে]