রম্যরচনা

আনাড়ির অবসরলিপি



সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়


আজ অনেক দিন পর কেন যেন অর্জুনের কথা মনে পড়ছে। অর্জুন... শহুরে অলিগলি তার যেমন পছন্দ, তেমনই গ্রামগঞ্জের ঝিলবিলেও তার বিপুল প্রেম। সবখানেই তার জ্যাঠামো সইতে হয় আশপাশের সবাইকে। যেখানে যত প্রতিকূল অবস্থাতেই পড়ুক না কেন, নিজের শিরদাঁড়াকে ঋজু রাখাটা তার কাছে শেখার মত। তা এ হেন এক শিক্ষকের প্রেমে তো একাধিক মন রাধিকা হয়ে উঠবেই, আমিই বা তার ব্যতিক্রম হই কেমনে! এই অবধি পড়ে নিশ্চয়ই সকলে ভাবতে শুরু করেছ, এই রে, এ তো খুল্লাম খুল্লা পেয়ার করার গপ্পো শুরু হল দেখি। আরে দাঁড়াও দাঁড়াও, ভীমরতি ধরার বয়স হলেও তাকে বুড়ো আঙুল দেখানোয় পটু আমি।

অর্জুনকে আমি চিনি অনেক ছোট থেকে।আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম তাকে। অন্যদের দৃষ্টি কি তাকে ছুঁতো? কি জানি। আমি কিন্তু আসতে যেতে তাকে দেখতাম।কখনও সে আমায় খেয়াল করেছে কিনা জানিনা অবশ্য।

এভাবেই দিন কাটছিল। একবার হঠাৎই চলে গিয়েছিলাম মাসির বাড়ি, সম্পর্কে শ্বাশুড়ি হলেও বেশ ফ্রেন্ডলি এই মাসি। থাকতেন এমন এক জায়গায় যেখানে সকলের বাসা থাকলেও তাদের বাসার চাহিদা মেটেইনি কোনদিন। ভাবছ তো, মাথাটা গেছে। উঁহু, মাথা আমার ঠিক জায়গাতেই আছে, মাসির বাড়ি পালটেছে যদিও। আর হেঁয়ালি না করে বলি মাসির বাড়ি ছিল চাইবাসা। সেখান থেকে সকালবেলা দুই চাকায় চেপে একটু এদিক ওদিক ঘুরঘুর করতে করতে গিয়ে পড়া একটা অদ্ভুত জায়গায়, যেখানে পৌঁছে আমার বিস্ময়ের রিখটার স্কেল যে কোথায় পৌঁছেছিল আমি নিজেই জানিনা। দেখলাম, অর্জুন একা নয়, তার বেশ ভরভরন্ত সংসার আছে। কর্তা, গিন্নি, দুই রকমের মা বাবা,ছানা পোনা নিয়ে তার বিশাল যৌথ পরিবার। দমে গেলাম খানিক।ভিনজায়গায় অর্জুনের এমন এক সংসার থাকতে পারে, আমি কল্পনাই করিনি কেন, কারণ আমার শহর জামশেদপুরে তার আর কোন জ্ঞাতিকে আমি দেখিনি কখনও। তো, খানিক হতবাক হয়েই তাকিয়ে ছিলাম সপরিবার অর্জুনের দিকে। এরই মধ্যে আচমকা আবিষ্কার করলাম অর্জুন তার নিজের পরিবারের সঙ্গে কি যেন এক আলাপচারিতায় মগ্ন, আমায় দেখেও যেন চিনতেই পারছে না।ইসস, কি মন খারাপ যে করছিল তখন। তবে তা বেশিক্ষণ নয়। দেখতে পেলাম, তাদের গানের শব্দ আসছে মাটির কাছ থেকে.. গুনগুন করছে, কুলকুল করছে... আহা, মন ভরে গেল তাদের সে আলাপে। বসলাম মাটিতে। রুক্ষ জমিনদারি অর্জুনের, কিন্তু ওই যে রুক্ষ জায়গার প্রকৃতি যেমন রঙিন হয়ে সাজতে জানে, অর্জুনও তার ব্যতিক্রম নয়। সারা শরীরে তখন তার ঝিরিঝিরি ফুলের গয়না।শুধু তার নয়, একইরকম গয়নায় সেজে উঠেছে তার পুরো পরিবার। কোন পারিবারিক অনুষ্ঠান চলছে বুঝি। আমার সঙ্গীরা কে কোথায় কি করছে, সে বিষয়ে আমি তখন একেবারেই উদাসীন।শুধু বোঝার চেষ্টা করছি অর্জুনের ভাষা। শহরে যে একেবারে চুপচাপ, এই নিরিবিলি জায়গায় সে এমন বাঙ্ময়,আশ্চর্য তো। একটা সময় জিজ্ঞেস করলাম, এখানে এসেছ কবে? অর্জুন এখানে কবে ঘর বেঁধেছে সে কথা আমার দাদুও বলতে পারেননি, তিনি জন্ম থেকেই দেখছেন অর্জুনকে। জবাব এল পাশ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাওয়া এক যুবকের কাছ থেকে। জানলাম, এ জায়গার নাম, "লুপুংগুটু"... এখানের গাছের শিকড় বেয়ে ঝর্ণা বয়ে চলে কুলুকুলু... সে ঝর্ণা নাকি স্বাস্থ্য ফেরানোর মন্ত্রবারি... নৈঃশব্দের এক সুরময় উপস্থিতিতে বিহবল হয়ে সেখানে ছিলাম কতটা সময়, জানিনা। সম্বিৎ ফিরল আমার সঙ্গীদের বাড়ি ফেরার ডাকাডাকিতে। দেখলাম, সেখানে আসা অনেকেই বোতলে ভরে জল নিয়ে যাচ্ছে। আমরা অবশ্য সেসব কিছু করিনি। তবে ঝর্ণার উৎস যে কোথায়, তার খোঁজ করেও জানতে পারিনি, হয়ত কোন নদীই লুপুংগুটুতে মাটির তলা দিয়ে সন্তর্পণে অভিসারে আসে অর্জুনের কাছে।

অর্জুনকে চিনতে পারলে তোমরা? অর্জুন, যার পরিচয় তার ওষধিগুণে।

পরিচিতি: সঞ্চালিকা (বেতার ও দূরদর্শন)।