সংস্কৃতি ও বিনোদন

  • 'দোহার'-এর আয়োজনে সংগীত কর্মশালা ও সংগীতানুষ্ঠান

ঋতচেতা ভট্টাচার্য

গত ১১, ১২ এবং ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ পি সি চন্দ্র গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হলো 'দোহার'-এর তিনদিনের অনুষ্ঠানমালা। ১১ সেপ্টেম্বর গায়ক, সংগ্রাহক, গবেষক এবং বাংলা গানের দল দোহারের মধ্যমণি কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের জন্মদিনে আয়োজিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠান 'জন্মদিনের কালিকাপ্রসাদ - কথায় সুরে সোনা বন্ধুরে'। এইদিন পি সি চন্দ্র গার্ডেনের 'দ্য মেডোস' হলে বসে লোকসংগীতের ঐতিহ্যগত আসর। সেখানে দোহার এবং দোহারের বন্ধুরা সংগীত পরিবেশন করেন। এক্ষেত্রে বিশেষ প্রাপ্তি ছিল নিরঞ্জন হালদার এবং মৃগনাভি চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গান। দোহারের পরবর্তী প্রজন্মের তিন প্রতিনিধি আহিরী, রোহন এবং আশাবরিও এই আসরে সংগীত পরিবেশন করে। দোহারের বন্ধুদের মধ্যে ঋষি, তীর্থ, ঊর্মি, তনুশ্রী গানে গানে তাদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন।

এই দিনের আসরে উপস্থিত ছিলেন তরুণ প্রজন্মের অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিবান, উজ্জ্বল শিল্পী বগা তালেব। তিনি আদতে রাজশাহীর ভূমিপুত্র। আশৈশব বাংলার মাটির রূপ-রস-গন্ধে নিজের সাংগীতিক অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। শাস্ত্রীয় সংগীতের বিধিবদ্ধ শিক্ষা তাঁর সংগীতকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। আজ অপার বাংলার সংগীতপ্রেমী মানুষের কাছে বগা তালেব একটি আদরণীয় নাম। তাঁর গান সেদিন উপস্থিত শ্রোতার মনের আরাম এবং শান্তি এনে দেয়।

গানের দল 'দোহার' লোক সংগীত চর্চার মধ্যে দিয়ে আগামী প্রজন্মের হৃদয়ে শিকড়ের চেতনা ছড়িয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। গতকয়েক বছর ধরে তাই দলের সমস্ত কাজের পাশাপাশি নিয়মিত আয়োজন করা হচ্ছে লোকসংস্কৃতির কর্মশালা।

১২ এবং ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছিল 'মানুষ রতন ট্রাস্ট' পরিচালিত, গানের দল 'দোহার' নিবেদিত নবম কর্মশালা। পি সি চন্দ্র গার্ডেনে অনুষ্ঠিত দু'দিনের এই কর্মশালার বিষয় ছিল 'বাংলা-অসম মেলবন্ধন'। এবারের কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অসমের লোকসংগীত তথা কামরূপী লোকগীতির অন্যতম প্রবক্তা বিরিণা পাঠক।

অসমের কিংবদন্তি লোকসংগীত শিল্পী প্রয়াত রামেশ্বর পাঠক এবং ধনদা পাঠকের সুযোগ্যা কন্যা বিরিণা তাঁর সাংগীতিক ঐতিহ্যকে সমগ্র বিশ্বের দরবারে তুলে ধরছেন। তাঁর কাছ থেকে কামরূপী, ভাওয়াইয়া, বিহু প্রভৃতি গান এবং গানের গল্প শুনতে পাওয়া অবশ্যই সৌভাগ্যের কারণ, শহর কলকাতায় বসে এ সুযোগ সহজে মেলেনা।

১৩ সেপ্টেম্বর সন্ধের প্রথম নিবেদন ছিল জন্মশতবর্ষে প্রবাদপ্রতিম শিল্পী, সংগ্রাহক, সংস্কৃতি যোদ্ধা ভূপেন হাজারিকা, কালী দাশগুপ্ত এবং রণেন রায়চৌধুরীকে স্মরণ করে দোহারের শিল্পীদের উপস্থাপনা।

সুধাকণ্ঠ ভূপেন হাজারিকা কেবল অসম নয়, সমগ্র দেশের সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠস্বর তাঁর গানে মূর্ত করেছেন। তাঁর সংগীতে মানবতার বাণী যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনই নিপীড়িত মানুষের জীবনযন্ত্রণা আর তা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে সারা পৃথিবীর সুর যেন তাঁর সংগীতের স্রোতে এসে মিলিত হয়েছে।

কালী দাশগুপ্ত স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন সেই জীবন, যেখানে মানুষের আশা, আশাভঙ্গ আর হেরে যেতে যেতে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই থেকে জন্ম নেয় এক অদম্য যাপন। চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে থেকে দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন অসংখ্য গান। যাকে আমরা বলি চা-বাগিচার ঝুমুর। সে গান কেবল গান নয়, অজস্র রক্তক্ষরণের ইতিহাস। তা তিনি কেবল সংগ্রহ করেই ক্ষান্ত হননি, তুলে দিয়ে গেছেন যোগ্য হাতে। তাঁর দল 'লোকসরস্বতী' তাই আজও বহমান।

রণেন রায়চৌধুরী আদতে সিলেটের মানুষ। সিলেটের মাটিতে মিশে আছে হাজার বছরের লোকগানের সুর। সেই সুর কণ্ঠে ধারণ করে তিনি এলেন কলকাতা শহরে। সেকালের কলকাতা শহরের রাজনৈতিক-সামাজিক আবহাওয়া তাঁকে দিল বিশেষ পরিচয়। হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ঋত্বিক ঘটক প্রমুখের সাহচর্য এবং মিলিত প্রয়াসে একদিকে শহর ঋদ্ধ হলো তাঁর লোকসুরে, অন্যদিকে অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার মন্ত্র রূপ পেল গণসংগীতে।

এই তিন সুরের জাদুকরের জন্মশতবর্ষে তাঁদেরই গানে প্রণাম জানালো 'দোহার'।

এই সন্ধ্যার পরবর্তী পর্যায়ে ছিল কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের উপস্থাপনা। অত্যন্ত দক্ষতায় তাঁরা কর্মশালায় শেখা দুটি গান পরিবেশন করেন এবং সাধারণ শ্রোতা দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করে নেয়।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল বিরিণা পাঠকের পরিবেশনা। কামরূপী, বিহু, চটকা সহ নানা স্বাদের সংগীতে তাঁর স্বামী, খ্যাতনামা সংগীত পরিচালক এবং গায়ক জয় চক্রবর্তী তাঁকে সঙ্গ দেন। দোহারের শিল্পীরা তাঁদের সমস্ত বাদ্যযন্ত্র সহ মঞ্চে উপস্থিত থেকে সমগ্র অনুষ্ঠানটিকে পরিপূর্ণতা দান করেন। দু'দিনের এই কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা সেদিন যেমন নানা মণিমাণিক্যে ঝুলি ভরে নিয়ে ফিরে গিয়েছেন, তেমনি ফিরেছেন আগামী কর্মশালার প্রত্যাশা নিয়েও।

'মানুষ রতন ট্রাস্ট' পরিচালিত এবং 'দোহার' আয়োজিত এই কর্মশালা সংগীতপ্রেমী এবং সংগীত শিক্ষার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই দোহারও বিষয়টিকে গুরুদায়িত্ব হিসেবেই পালন করে। আগামীদিনে এই সামগ্রিক কর্মকাণ্ড সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে মানুষ রতন ট্রাস্ট এবং দোহার সকলের আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা প্রার্থনা করে।

প্রতিবেদক: শিক্ষিকা, রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী, 'দোহার' পরিবারের অন্যতম সদস্য। কলকাতা।

  • মল্লিকা সেনগুপ্তের 'কথামানবী' আবৃত্তি প্রযোজনা থেকে শ্রুতিপাঠ: দুই দশকের পথচলা

'কথামানবী'র সদস্যবৃন্দ

'কথামানবী' একটিই কবিতা অথবা অসমাপ্ত ইতিহাসগীতিকা।এটি ১২০০ লাইনের দীর্ঘ কবিতা। গ্রন্থটিতে ঋগ্‌বেদ থেকে একুশ শতক পর্যন্ত উপেক্ষিত নারীর ইতিহাসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই ইতিহাস নারীর রচিত ইতিহাস। ইতিহাস শব্দটিকে নারীবাদীরা এভাবে ভেঙেছেন – History-his story; অর্থাৎ পুরুষের গল্প। ইতিহাসে নারীদের এই প্রান্তিক অবস্থান থেকে নারীবাদীরা ÔHis storyÕ এর বিপরীতে ÔHer storyÕ রচনায় মনোযোগী হয়েছেন। এই ধারার প্রথম পদক্ষেপ হলো ইতিহাসের পাতায় অদৃশ্য, প্রান্তিক নারীদের উপস্থিত করা, দৃশ্যমান করা। মল্লিকা সেনগুপ্ত মূলত 'কথামানবী' গ্রন্থটিতে নারীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু চরিত্র চিত্রণ করেছেন। আমরা এই প্রযোজনাতে দৌপদী, সুলতানা রিজিয়া, মালতী মুদি, শাহবানু ও ক্ষণা এই পাঁচটি চরিত্রকে উপস্থাপন করেছি। এই চরিত্রগুলো প্রতিনিধিত্ব করেছে একটি বিষয়ের – দেশ, কাল, সময়, ধর্ম ও শ্রেণিভেদে নারী মূলত পুরুষতান্ত্রিকতার শিকার।

'কথামানবী' বলছেন আমি জিভ কেটে নেয়া ক্ষণার বচন – এই উক্তি মূলত নারী যে সত্য বলতে চাইলেও পুরুষতন্ত্র তার মুখ চেপে ধরে সেই চিরাচরিত বিষয়টিকে ব্যক্ত করেছে। দ্রোপদী চরিত্রটিকেই দেখুন – পুরুষে পুরুষে যুদ্ধ, প্রতিশোধ রমণীর শ্লীলতাহানিতে। সেই শ্লীলতাহানি বর্তমান সময়ে এসেও একই রকম রয়ে গেছে।

শাহবানু মুসলিম নারী। ধর্ম মোতাবেক ঘরের মধ্যেই তাঁর পৃথিবী। এই নারীকে যখন পুরুষ তালাক দিচ্ছে তখন কীভাবে সে তাঁর ক্ষুণ্নিবৃত্তি করবে! ইদ্দতকাল শেষ হবার পর খোরপোষের দাবিটিও পুরুষতন্ত্র ধর্মর দোহাই দিয়ে এড়াতে চায়।

আমরা নারী। আমরা এই পৃথিবীটাকে গর্ভে ধারণ করি, মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখি অথচ আইনে আমরা শিশুর অভিভাবক নই।

'কথামানবী' এই গ্রন্থের মাধ্যমে পুরুষের কাছে একটি বার্তা পাঠাতে চেয়েছেন। নারী পুরুষের কাছে কেমন ব্যবহার প্রত্যাশা করে – রাজার সঙ্গে রাজার ব্যবহার, মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবহার। তাঁর মতে পুরুষ নারীকে ভালোবেসেছে, পীড়ন করেছে। মানুষ ভাবেনি। সে কারণেই আবহমানকালের সঙ্গী পুরুষের প্রতি কথামাবনীর প্রতিবাদ অতীতেও অব্যাহত ছিল, বর্তমান ও ভবিষ্যতেও থাকবে।

ফলে বর্তমান সময়েও 'কথামানবী'র প্রাসঙ্গিকতা অনিবার্য। এই প্রযোজনা নারীকে যেমন সমাজে তার অবস্থান সম্পর্কে সচেতন করবে তেমনি নারীর প্রতি পুরুষের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

'কথামানবী' এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বার, ছায়ানটে একবার মঞ্চস্থ হয়েছে। ২০০২ সালে ধ্বনির ২য় উৎসবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম 'কথামানবী' মঞ্চস্থ হয় দ্রোপদী, সুলতানা রিজিয়া, মালতী মুদি ও খনা এই চারটি চরিত্র নিয়ে।...

মূলত আমাদের প্রযোজনাটি ওই সময় আমরা সেভাবে সংরক্ষণ করিনি। এবার কাজটির ব্যাপ্তি দেশের সীমানা পার হয়েছে। দ্রোপদী ও ক্ষণা চরিত্র দুটি দেশের বাইরে থেকে এই প্রযোজনাতে অংশগ্রহণ করেছে। নাটকের মতো আমাদের প্রযোজনাতেও চরিত্র ও শিল্পীর যোগ-বিয়োগ ঘটেছে। দ্রোপদী, ক্ষণা এই চরিত্রগুলো এক এক সময় এক এক জন বাচিকশিল্পী করেছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমরা আমাদের নির্মাণ ভাবনাটি রেখে যেতে ইচ্ছুক। সেই কারণেই শ্রুতিপাঠ মাধ্যমটি আমরা বেছে নিয়েছি। সেই সঙ্গে নারী-পুরুষ সমতার চাবিটি এই প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে চাই প্রযোজনাটির মাধ্যমে।

নির্দেশক: শ্রাবণী নাসরিন

১.১ দ্রোপদী ও খনা: দ্বৈত চরিত্রে আমি

'কথামানবী' আমার কাছে শুধু একটি আবৃত্তি প্রযোজনা নয়। এটি সময়ের সীমানা পেরিয়ে নারীর লড়াই, প্রজ্ঞা, অপমান, প্রতিবাদ আর আত্মমর্যাদার অসংখ্য গল্পকে একই কণ্ঠে ধারণ করার এক অনন্য অভিজ্ঞতা। 'কথামানবী'র সঙ্গে আমার পথচলাও দুই সময়ে, দুই ভিন্ন নারী চরিত্রের হাত ধরে। ধ্বনি আবৃত্তি উৎসব ২০১৭-এ আমি প্রথম এই প্রযোজনায় অংশ নিই। আমার চরিত্র ছিল খনা। প্রখর মেধা, জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ আর দূরদৃষ্টিতে খনা ছিলেন তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা এক নারী। অথচ তাঁর জ্ঞান ও কণ্ঠকে স্বীকৃতি দেওয়ার বদলে তাঁকে স্তব্ধ করে দেওয়ার গল্পই আমরা বহন করে চলেছি শতাব্দীর পর শতাব্দী। খনার চরিত্রে কাজ করতে গিয়ে তাই আমার কাছে সবচেয়ে গভীর হয়ে উঠেছিল একটি প্রশ্ন। একজন নারীর জ্ঞান, স্বাধীন চিন্তা আর নিজস্ব কণ্ঠ কেন কখনো কখনো সমাজের কাছে এতটাই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে যে সেই কণ্ঠকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়?

এবার ২০২৬-এ ধ্বনি যখন 'কথামানবী' অডিয়োবুক হিসেবে প্রকাশ করছে, তখন আমার চরিত্র দ্রৌপদী। খনার রুদ্ধ করে দেওয়া কণ্ঠ থেকে দ্রৌপদীর প্রকাশ্য প্রশ্ন ও প্রতিবাদ। আমার জন্য এই যাত্রাটি ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। দ্রৌপদী অপমানিত হন, সভার মাঝখানে তাঁর মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করার চেষ্টা হয়, কিন্তু সেই অপমান তাঁকে নিঃশব্দ করে না। বরং তিনি প্রশ্ন তোলেন ক্ষমতাকে, সমাজকে, এমনকি সেই সময়ের প্রতিষ্ঠিত ন্যায় অন্যায়ের ধারণাকেও। তাঁর ক্ষোভ, আত্মমর্যাদা আর প্রতিবাদ তাই শুধু নিজের জন্য নয়। যুগে যুগে অপমানিত, অবদমিত ও অসম্মানিত অসংখ্য নারীর হয়ে উচ্চারিত এক প্রশ্ন হয়ে ওঠে। খনা ও দ্রৌপদী এই দুই চরিত্র আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, নারীর অবস্থানও অনেক এগিয়েছে। কিন্তু নারীর কণ্ঠকে উপেক্ষা করা, তাঁর মেধা ও যোগ্যতাকে খাটো করা, স্বাধীন মতপ্রকাশের জন্য তাঁকে আক্রমণ করা কিংবা তাঁর শরীর ও মর্যাদাকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। খনার জিহ্বা কেটে নেয়ার মতো আজকের নারীদেরও পরিবার, কর্মক্ষেত্র, কিংবা সমাজে কণ্ঠ থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা আমরা এখনও দেখি। আবার দ্রৌপদীর অপমানও শুধু মহাকাব্যের একটি দূরবর্তী ঘটনা হয়ে থাকেনি। নারীর প্রতি সহিংসতা, হয়রানি, অপমান এবং ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতার মধ্যে তার প্রতিধ্বনি আজও খুঁজে পাওয়া যায়।

এই দুই চরিত্রে কণ্ঠ দিতে পারা আমার জন্য তাই শুধুই আবৃত্তির অভিজ্ঞতা নয়, ব্যক্তিগতভাবেও গভীর এক অনুভব।

বাচিকশিল্পী: শিখা অনির্বাণ

১.২ 'কথামানবী' সুলতানা রিজিয়া: আত্মোপলব্ধির এক ঐতিহাসিক যাত্রা

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম ও একমাত্র নারী শাসক সুলতানা রিজিয়া। তিনি দিল্লির সুলতান হিসেবে ১২৩৬ থেকে ১২৪০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সিংহাসনে আসীন ছিলেন। একজন নারী হিসেবে সুলতানা রিজিয়া আমার কাছে বিস্ময়ের, অহংকারের ও আগ্রহের একটি ঐতিহাসিক চরিত্র।

ধ্বনির ২য় উৎসবের 'কথামানবী' প্রযোজনাতে সুলতানা রিজিয়াকে কণ্ঠে ফুটিয়ে তোলার জন্য যখন আদিষ্ট হলাম, কেমন যেন থম মেরে গেলাম। আমি! আমার মতো অতি সাধারণ একজন, এই সমাজ, প্রচলিত প্রথা, গতানুগতিক জীবনযাপন সব কিছুকে মানিয়ে-গনিয়ে চলতে চলতে আমি আমার শিক্ষাজীবন পার করেছি। তারপর খুব ছা পোষা কিছু উপার্জনের মাধ্যমে মধ্যবিত্ত সংসার জীবনকে টেনেটুনে পার করছি। সেই আমি চার চার বার সুলতানার চরিত্র ধারণ করেছি। প্রথমে খুব ভয় ছিল আমি কি ধারণ করতে পারব সুলতানাকে। পাছে তার অপমান না করে ফেলি। যে আভিজাত্য, বৈভব, সাম্রাজ্য শাসনের যোগ্যতা, যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শিতা ও সৌন্দর্য দিয়ে সুলতানা রিজিয়া আমার সামনে মূর্ত হয়ে উঠেন তার কিছু তো নিজের মধ্যে খুঁজে পাচ্ছিলাম না আমি।

তারপর, আমার প্রাণের সংগঠন 'ধ্বনি' নির্ধারণ করলো 'কথামানবী'র নির্দেশকসহ বাকি বাচিকশিল্পী কারা হবে। চমৎকার একটি আগ্রহী, প্রাণোচ্ছল টিম কাজ শুরু করলাম। অনুশীলনের সময়টা ছিল একই সঙ্গে মজার ও বিরক্তির। দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিতে নিতে নিজের মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখতে পেলাম। একজন নারী যেমন সন্তানকে গর্ভে বড়ো করতে করতে ধীরে ধীরে মা হয়ে উঠেন, আমিও তেমনি সুলতানা রিজিয়ার চরিত্রকে কণ্ঠে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতে করতে ভেতরে ভেতরে রিজিয়া হয়ে উঠলাম যেন। কোনো বিষয় নিয়ে গভীরে চিন্তা করা, নিজের মতামত রাখা, প্রয়োজন মতো প্রতিবাদ করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ও নেতৃত্ব দানে আগ্রহী হয়ে উঠলাম। নিজেকে সাধারণ ছাপোষা মনে করাটা কেটে গেল যেন। আমিও চাইলে অনেক কিছু করতে পারি এই দৃঢ়তা হৃদয়ে ধারণ করতে শিখলাম। 'কথামানবী' কয়েকবার মঞ্চায়িত হয়েছে, এইবার অডিয়ো বুক হিসেবে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।

সুলতানার চরিত্র প্রথম মঞ্চায়নের সময় যে শিহরণ লেগেছিল হৃদয়ে তা বর্ণনাতীত। সংগঠন 'ধ্বনি'র কল্যাণে ততোদিনে মঞ্চ ভীতি আমার কেটে গেছে। সুলতানার সাজপোশাকে, আবহ সংগীতের ব্যঞ্জনায়, নানাবিধ আলোকসজ্জায় মহা আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনে 'কথামানবী'র অন্যান্য চরিত্রের সঙ্গে যখন মঞ্চে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম আমার সমস্ত সত্তা তখন মনেপ্রাণে সুলতানা রিজিয়া হয়ে উঠেছে। দর্শক ও অতিথিদের করতালি ও আমাদের উপলব্ধি বিবেচনায় 'কথামানবী'র মঞ্চায়ন সফল হয়েছিল বলেই আমার মনে হয়। তবে মঞ্চের উপস্থাপন ও স্টুডিয়োতে রেকর্ড করার অভিজ্ঞতা দুইরকম। মঞ্চে দর্শকদের থেকে যে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় রেকর্ডিং-এ তা হয় না। তাই অডিয়ো বুক বের করা আমার জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা । সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলায়। আমাদের জীবনে প্রযুক্তির অপরিহার্যতার কথা বলে শেষ হবে না। অডিয়ো বুকটি সমগ্র দেশের এমনকি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দূরদেশিদের কাছে পৌঁছে যাবার সুযোগ রয়েছে। অডিয়ো বুক 'কথামানবী'র এটিও একটি পরম অর্জন বলে মনে করি। 'কথামানবী'র এই দীর্ঘ যাত্রায় আমি ব্যক্তিজীবনে যেমন সমৃদ্ধ হয়েছি, সুলতানা রিজিয়া হিসেবেও বেশ পরিপক্ব হয়েছি বলেই মনে করি। 'কথামানবী' নারী জন্মের বঞ্চনার, অত্যাচারের, নিগ্রহের, ভালোবাসার কথা বলেছে। 'কথামানবী' পৌঁছে যাক সকলের হৃদয়ে, স্পর্শ করুক সকল মানবের অনুভূতি। 'কথামানবী' সার্থক হোক, আনন্দের, বিজয়ের পথে হাঁটুক। সেই যাত্রায় আমি যেন হই তার সার্বক্ষণিক সহযাত্রী।

বাচিকশিল্পী: মাহফুজা খানম

১.৩ মালতী মুদি: এক অগ্নিকন্যার মূর্ত রূপ

'কথামানবী' ইতিহাসগীতিকাতে মালতী মুদি পুরুলিয়ার এক আদিবাসী মেয়ে। এক অগ্নিকন্যা। ২০০১ সালে সদ্য জাহাঙ্গীরনগরে ভরতি হয়ে আবৃত্তি সংগঠন ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। সেই সময় মালতী মুদি চরিত্রটি আমার জন্য ছিল এক বিস্ময়। পারিবারিক সুবিধাপ্রাপ্ত আমি কখনো নারী হিসেবে কোনো প্রতিবন্ধকতার শিকার হইনি। 'কথামানবী' পড়ে, নারীর প্রতি সহিংসতার ধারাবাহিক ইতিহাস আমার মধ্যে আমূল পরিবর্তন আনে। আমি যেন এক নতুন আমি হয়ে উঠি। জাহাঙ্গীরনগরকে বলি আমি আমার দ্বিতীয় জন্মের আঁতুড় ঘর। আর সেই নতুন জন্মে নারী অধিকার, দেশপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম ও যুদ্ধবিরোধী কবিতা আমাকে এখনকার ফাল্গুনী তানিয়াতে রূপান্তর করেছে।

এবার আসি চরিত্র প্রসঙ্গে। মালতী মুদি একজন ধর্ষিত নারী। তাঁকে ধারণ করার মতো অভিজ্ঞতা আমার না থাকলেও প্রতিনিয়ত বাসে, রাস্তায়, ক্লাসরুমে, সংসারে নারীরা যে ধর্ষিত হয় তা আমাকেও আর দশটা নারীর মতো অনুভব করতে হয়। তবে আমাদের সমাজে ধর্ষকের বিচার হয় না, হয় ধর্ষিতার। ধর্ষক বুক ফুলিয়ে সমাজে হেঁটে বেড়ায়, ধর্ষিতা লজ্জায় অপমানে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। মালতীর পরিণাম মূলত সব ধর্ষিতা নারীর পরিণাম। কিন্তু মালতী যেভাবে লড়াই করেছে পার্টি, পুলিশ এমনকি নিজের পরিবারের সঙ্গে সেটা সব নারী পারে না। আমাদের সমাজে শৈশব থেকে নিজের আত্মীয়-স্বজনদের দ্বারাই নারীশিশু নিপীড়িত হয়। লোকলজ্জার ভয়ে শিশুটির মা-বাবাও শিশুটির মুখ চেপে ধরে। সেখানে মালতী যে সমাজে বড় হয়েছে সেই সমাজে মালতীর লড়াইটা আমাকে ভাবিয়েছে প্রতিনিয়ত। আমি চরিত্রের গভীরে গিয়ে যতবার মালতীকে অনুভব করেছি তাকে স্যালুট জানিয়েছি। তাকে ধারণ করার চেষ্টা করেছি। প্রতিবার চরিত্রের আরও গভীরে যেতে চেষ্টা করেছি।

মালতী মঞ্চে করতে গিয়ে পোশাক ও রূপসজ্জা নিয়ে বারবার গবেষণা করা হয়েছে। তখন গুগলের যুগ ছিল না। তাই পুরুলিয়ার আদিবাসীদের পোশাক সম্পর্কে জানার উপায় ছিল না। জাহানারা ইমাম হলের নাট্যতত্ত্বের আপুরা আমাকে বিশেষভাবে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছিলেন প্রথমবার। চরিত্র হয়ে ওঠার সেটা ছিল প্রথম ধাপ। পোশাক যেন মুহূর্তে আমাকে বদলে দিলো। পরের বার আদিবাসী রেয়ন কাপড়ের বিশেষ পোশাক পরিধান করলাম। ছায়ানটে বিশেষ কায়দায় পরলাম শাড়ি, বিউটি পার্লারে গিয়ে কালো হয়ে এলাম আর মাথায় দিলাম ময়ূরের পালক। শেষবার জাহাঙ্গীরনগর মুক্তমঞ্চে শো ছিল। এত শীত! আমি সোয়েটারের ওপর নতুন শাড়ি পরে বিসদৃশ একটা জীবে পরিণত হলাম। সেও ভালো কিন্তু গলা যে ঠিক ছিল তাতেই খুশি ছিলাম শীতকাতুরে এই আমি। মালতী হয়ে মঞ্চে বসতাম আর আমার বুক ঢিপঢিপ শুরু হতো। সুধা যখন ওর জাদুকরি গলার হামিং শুরু করতো আমি যন্ত্রচালিতের মতো উঠে দাঁড়াতাম। আর নির্ঝর বিসর্জনের বাদ্য বাজাতে শুরু না করলে আমি মালতী কখনো দুর্গা হয়ে উঠতে পারতাম না। ওদের কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা। অনুশীলন করার সময় কত হাস্য পরিহাস করেছি আমরা! পুলিশ চরিত্র কীভাবে কথা বলবে সেটা নিয়ে যা যা ভাবা হয়েছে সে থিসিস লেখার মতো। বিল্পব দা, বুলবুল ভাই এদের কয়েক রকম টোন ও ভঙ্গিতে সংলাপ বলা এখনো মনে পড়ে। আর একটা কথা না বললেই নয়, ঢাকাতে অনুশীলনের সময় আমাদের এক সময়ের দ্রোপদী চরিত্র মিতু আপার বাসাতে আমরা মজার মজার নাস্তা করতাম। আমাদের সঙ্গে বাচ্চারাও তখন 'কথামানবী'র সংলাপ বলা শুরু করেছে। আমরা হেসে কুটিপাটি হতাম। আমাদের মুখরিত সময়ের সেই অমূল্য স্মৃতিগুলো সারা জীবনের সঞ্চয়।

মালতী মুদি আবৃত্তি করে প্রতিবার আমি অনেকের প্রশংসা পেয়েছি তবে গ্রিনরুমে প্রথম শো'এর পর যখন আমার নির্দেশক আমাকে খুশি হয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন সেটা ছিল প্রতিবার আমার নিজেকে অতিক্রম করার প্রেরণা। এই কথা কখনো তাঁকে বলা হয়নি। আজ যখন সুযোগ পেয়েছি তখন বলতে চাই নির্দেশকের বকাবকি না থাকলে আসলে কোনো কাজ আরও ভালো করার তাগিদ তৈরি হয় না। আর শাসনের সঙ্গে অনেক বেশি জড়িয়ে থাকে সোহাগ।

'কথামানবী' অডিয়ো বুক মূলত আমাদের অনেক স্মৃতিকে সংরক্ষণ করার একটি উদ্যোগ। মঞ্চ ও অডিয়োর প্ল্যাটফর্ম সম্পূর্ণ আলাদা। মঞ্চে কাজ করা বেশ সহজ। জোড়াতালির অডিয়ো বুকে মঞ্চের আস্বাদ নেই, আছে সময়ের বুকে নিজের অস্তিত্বকে রেখে যাওয়ার প্রচেষ্টা, অনেকের কাছে পৌঁছে যাওয়ার আকুতি, অনেকের সমালোচনা শুনে নিজেকে আরও ঢেলে সাজানোর আগামী। এই যাত্রায় প্রত্যেক শ্রোতার প্রতি আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

বাচিকশিল্পী: ফাল্গুনী তানিয়া

১.৪ 'কথামানবী' শাহবানু

'কথামানবী' ইতিহাসগীতিকাটিতে লেখক আবহমানকাল ধরে নারীর বিভিন্ন আপোশহীন চরিত্রকে আলোকিত করেছেন। আর সেই প্রাচীন আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সকল ধর্মের, কর্মের নারীই হয়েছেন তথাকথিত পুরুষ শ্রেণির দ্বারা নিগৃহীত ও অধিকারবঞ্চিত। এমনই কিছু নারীচরিত্র নিয়েই আমাদের শ্রুতিপাঠ 'কথামানবী'।

আমার চরিত্রের নাম শাহবানু। আমি প্রথমবার শাহবানু চরিত্র করে যতটা না চরিত্রের কাছাকাছি যেতে পেরেছি তার চেয়ে তৃতীয়বার আরও বেশি চরিত্রকে অনুধাবন করেছি। প্রথম যখন আমি জাহাঙ্গীরনগরে এই চরিত্রটি করেছি তখন আমি ছাত্রী, ছায়ানটে যখন করেছি তখন আমি কন্যা থেকে বৌ হয়েছি, আর এখন আমি মা। শাহবানুর মতো একজন সংসারী বোরখাআবৃতা নারী। সুতরাং সেই সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে এই সময়ের বাস্তবতার অনেক প্রভেদ। তাই আমার চরিত্রের নির্মাণ, কণ্ঠের দৃঢ়তা বারবার অনেক বদলে গিয়েছে।

একজন মুসলিম নারী যে কখনো ঘরের বাইরে যায়নি, যার আর্থিক সামর্থ্য নেই, বিনা কারণে তালাক প্রাপ্ত হলেও সমাজ, প্রশাসন তার খোরপোশ দিতে বাধ্য নয়। তাকে তার অধিকারবঞ্চিত করা হয়। আর সেই খোরপোশের অধিকার আদায়ে মুসলিম নারী শাহবানু আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করে। তাকে ভেঙে ফেলতে, গুড়িয়ে দিতে তাঁর স্বামী, সমাজ ও সমাজের ভিতরের হায়নারূপী মানুষগুলো কতটা নৃশংস রূপ ধারণ করে তা এই শ্রুতিকাব্যে ফুটে উঠেছে। শেষে আদালত তাকে অধিকার দিলেও দেশের প্রশাসন, তাকে অধিকার দিতে অস্বীকার করে। এ যেন নারীনিগ্রহের বাস্তর রূপ যার চর্চা আমাদের প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি দেশে।

এবারে আমরা 'কথামানবী'র শ্রুতিপাঠ প্রকাশ করছি। এক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা নতুন নয়। দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ বেতারে কণ্ঠ দিয়েছি আমি। ব্যক্তিগত নানা সমস্যার কারণে সেই চর্চাটা ধরে রাখতে পারিনি। রুটি-রুজির ব্যস্ততাতে আমার কাজে সময় কম দিতে পেরেছি তবে এর মধ্যেই চেষ্টা করেছি আমার সেরাটা দিতে।

ধন্যবাদ নির্দেশক এবং টিমের সকল সদস্যকে। আশা করি এই শ্রম ও প্রয়াস আপনারদের ভালো লাগার জায়গা দখল করে নিতে পারবে।

বাচিকশিল্পী: সেলিনা পারভীন

১.৫ খনা

বাংলার লোকঐতিহ্যে খনা একজন পরিচিত চরিত্র। কৃষি, প্রকৃতি, আবহাওয়া ও মানুষের জীবন নিয়ে তাঁর জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণ আজও 'খনার বচন'-এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে প্রচলিত। তাঁর জীবন নিয়ে ইতিহাস ও লোককথায় নানা কাহিনি রয়েছে। একজন জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান নারী হিসেবে খনার পরিচয় আমাদের সংস্কৃতিতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

'কথামানবী'-তে খনার চরিত্রে কণ্ঠ দেওয়ার সুযোগ পেয়ে প্রথমে যেমন ভালো লেগেছিল, তেমনি কিছুটা চিন্তাও হয়েছিল। ঐতিহাসিক ও লোকঐতিহ্যের চরিত্রটিকে শুধু নিজের কণ্ঠের মাধ্যমে স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা আমার জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। কীভাবে খনার জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস ও ব্যক্তিত্বকে কণ্ঠের মাধ্যমে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেব – এটাই ছিল আমার প্রধান ভাবনা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যে চরিত্রটি আত্মস্থ করা অনেক সহজ ছিল প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে সব সামলিয়ে সেই চরিত্রটিকে দুই যুগ পরে আবার কণ্ঠে ধারণ করা আমার জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল। বিশেষ করে এমন একটি পরিবেশে যেখানে সারা দিন বাংলাতে কথা বলার মতো অনুকূল পরিবেশও জোটে না। এখন আমার উচ্চারণের ত্রুটিগুলোও সে কারণে আমার কানে ধরা পড়ে না।

আমার প্রাথমিক প্রস্তুতিটা ছিল মূলত নিজের মতো করে। স্ক্রিপ্ট বারবার পড়েছি, সংলাপ বলেছি এবং নিজের কণ্ঠ রেকর্ড করে শুনেছি। কোথায় উচ্চারণ ঠিক করতে হবে, কোথায় একটু থামতে হবে, কোথায় গতি কমাতে বা বাড়াতে হবে কিংবা কোথায় আবেগ দিতে হবে – সেগুলো নিজেই অনুশীলন করেছি। এরপর নির্দেশকের কথা মতো অনুশীলন করার চেষ্টা করেছি। অনেকবার বলার পরও যখন মনে হয়েছে ঠিক হচ্ছে না, আবার শুরু করেছি। বিশেষ করে চেয়েছি, খনার কথাগুলো যেন শুধু মুখস্থ সংলাপ মনে না হয়; বরং আমার কণ্ঠে যেন তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ফুটে ওঠে।

মঞ্চে কবিতা আবৃত্তি এবং অডিয়োবুকে কণ্ঠ দেওয়ার মধ্যে পার্থক্যটাও এই কাজের মাধ্যমে নতুনভাবে বুঝেছি। মঞ্চে অভিনয়ের সময় মুখের অভিব্যক্তি, শরীরী ভাষা ও উপস্থিতির মাধ্যমে চরিত্রকে প্রকাশ করা যায়। কিন্তু অডিয়োবুকে শুধু কণ্ঠ, উচ্চারণ, গতি, থামার জায়গা ও আবেগের মাধ্যমেই চরিত্রটিকে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে হয়। তাই এই কাজের ক্ষেত্রে কণ্ঠের ওপর আরও বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছে। বিষয়টি আমার জন্য নতুন হলেও খুবই শিক্ষণীয় ও আনন্দের ছিল।

এই চরিত্র নিয়ে কাজ করতে করতে খনার চরিত্রটি আমার কাছে ধীরে ধীরে আরও আপন হয়ে উঠেছে। তাঁর জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের কথা বলার সাহস আমাকে ব্যক্তিগতভাবেও অনুপ্রাণিত করেছে। খনার প্রতি আমার আগ্রহ আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে একজন নারী হিসেবে নিজের চিন্তা ও মতামতকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও নতুন করে অনুভব করেছি। আমার আশা, 'কথামানবী' শুধু একটি পরিবেশনা হিসেবে নয়, নারীদের জীবন, চিন্তা, অনুভূতি ও সংগ্রামের গল্প হিসেবেও মানুষের কাছে পৌঁছাবে। খনার মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্রকে নতুন প্রজন্মের শ্রোতারা নতুনভাবে জানার সুযোগ পাবে – এটাই আমার ভালো লাগার একটি বড়ো কারণ।

সবশেষে, 'কথামানবী' টিমের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। এই কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে আমাকে সাহস দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন, ভুল-ত্রুটি শুধরে দিয়েছেন এবং পুরো প্রক্রিয়াটিকে সহজ করে তুলেছেন। তাঁদের ধৈর্য, আন্তরিকতা, উৎসাহ এবং পাশে থাকার অনুভূতি আমার কাছে সত্যিই অনেক মূল্যবান। তাঁদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাওয়াটাই আমার জন্য একটি বড় পাওয়া। এই সুন্দর কাজের সঙ্গে আমাকে যুক্ত করার জন্য 'কথামানবী' টিমের সবাইকে হৃদয় থেকে ধন্যবাদ। শ্রোতাদের জন্যও রইল অনেক ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও শুভকামনা।

'কথামানবী' এবার অডিয়োবুক হিসেবে নতুনভাবে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাতে যাচ্ছে। আমার আন্তরিক শুভকামনা – 'কথামানবী' আরও অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাক, শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যাক এবং এর পথচলা আরও সুন্দর ও সফল হোক। এই কাজের অংশ হতে পেরে আমি আনন্দিত, কৃতজ্ঞ ও গর্বিত। খনা চরিত্রে কণ্ঠ দেওয়ার এই অভিজ্ঞতা আমার কাছে সবসময়ই একটি সুন্দর ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।

বাচিকশিল্পী: পপি সাহা

১.৬ 'কথামানবী' আমার অন্যতম পছন্দের একটি প্রযোজনা। প্রায় দুই দশক আগে থেকে আমি এই প্রযোজনার আবহ সংগীতের সাথে জড়িত। সাধারণত কোনো প্রযোজনার আবহ সংগীত করার ক্ষেত্রে কাহিনি, চরিত্র, কণ্ঠশিল্পীর পরিবেশনা এবং সর্বোপরি নির্দেশকের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করি। নির্দেশকের চিন্তাধারার সাথে নিজের চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়ে এই প্রযোজনার নির্মাণ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করেছি। সেই অনুযায়ী কণ্ঠ ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করারও চেষ্টা করেছি।

এই কাহিনির মূল চরিত্রগুলো ঐতিহাসিকভাবে ভিন্ন সময়ের, ভিন্ন স্থানের ও ভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় চিত্রিত। কিন্তু নারীর প্রতি পুরুষের ভাবনার যে বহিঃপ্রকাশ, তা প্রায় অভিন্ন। মল্লিকা সেনগুপ্ত যেন কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছেন। তাই এই প্রযোজনায় 'কথামানবী' যখন প্রত্যেক চরিত্রকে একে একে পরিচয় করাতে থাকেন, তখন তার কথার কোনো আবহ তৈরি করার চিন্তা মাথায় আসেনি। কারণ, তার কথাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং যেহেতু তিনি সময় ও সমাজের বাইরে কথকের ভূমিকায় অবস্থান করছেন। কিন্তু যখন কোনো চরিত্র স্বরূপে আত্নপ্রকাশ করেছে তখন আবহ সংগীতের সাহায্য নেয়া হয়েছে। কারণ দর্শক ও শ্রোতাকে শব্দের মাধ্যমেই স্থান ও সময় বোঝাতে হয়।

যেমন মহাভারতের দ্রৌপদীর ক্ষেত্রে রাজা ধৃতরাষ্ট্রের রাজসভার পরিবেশ, তার বস্ত্রহরণের সময় শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ এবং আন্তরিক ঘৃণা নিয়ে প্রস্থানের দৃশ্য তৈরি করতে গিয়ে শাঁখ, মন্দিরা, দুন্দুভির আওয়াজের বিকল্প হিসেবে বিগ ড্রাম ও মহাভারতের মূল সংস্কৃত শ্লোক ব্যবহার করা হয়েছে।

একইভাবে সিংহলের বিদূষী নারী খনার ক্ষেত্রে সিংহলী লোকসংগীত, খনার যুক্তিযুদ্ধে বাঁশি ও দুন্দুভির সমন্বিত আওয়াজ তৈরি করা হয়েছে।

পরম্পরায় দিল্লিশ্বরী সুলতানা রাজিয়ারর ক্ষেত্রে দিল্লি সালতানাতের থিম মিউজিক হিন্দুস্থানি দরবারি সংগীতের সাহায্যে করা হয়েছে।

আদিবাসী বিদ্রোহী মালতী মুদির জীবনকাহিনির আবহ নির্মাণে সাঁওতালী লোকসংগীত, দুর্গার রূপ ধারণে শঙ্খ, ঢাক ও কাঁসির সমন্বিত বাদ্যের ব্যবহার করা হয়েছে।

একটি অন্ধ সমাজে আবদ্ধ দুঃসাহসী নারী শাহবানুর চরিত্রের নির্মাণে অতিরিক্ত আবহসংগীতের তেমন কোনো প্রয়োজন পড়েনি। ঘটনার সময়ের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে কোর্ট, জনসাধারণের বিক্ষোভ প্রভৃতি দৃশ্যের উপযোগী শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

আবহসংগীত কখনোই কণ্ঠকে ছাপিয়ে যায় না। এটি কণ্ঠের পারফরম্যান্সকে অলংকৃত করে। 'কথামানবী'র ক্ষেত্রেও তাই কথাকেই মুখ্য বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

আবহশিল্পী: নির্ঝর অধিকারী