সংস্কৃতি ও বিনোদন


  • জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপনের সমাপ্তিতে কলকাতায় দু'দিন ব্যাপী সুকান্ত সম্মেলন

কবি সুকান্ত তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে কাব্যে-সৃষ্টিতে-জীবনচর্যার মধ্য দিয়ে যে স্বপ্নের বীজ বপন করে গেছেন, সেই স্বপ্ন রূপায়ণের পথেই আমাদের অগ্রসর হতে হবে। আজকের এই দুঃসহকাল অতিক্রম করতে কবির সব অসামান্য সৃষ্টিকে অন্যতম আয়ুধ হিসেবে আমাদের ব্যবহার করতে হবে। সুকান্ত জন্মশতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সুকান্ত সম্মেলনে এই বার্তাই ধ্বনিত হয়েছে।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য-এর জন্মশতবর্ষ নানা সমারোহে পালনের জন্য পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল সুকান্ত ভট্টাচার্য জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন কমিটি। ২ আগস্ট, ২০২৫ এই কমিটির আয়োজনে জন্মশতবর্ষের সূচনা অনুষ্ঠান হয়েছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মস্থান জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির রথীন্দ্র মঞ্চে। এদিন রবীন্দ্রনাথ ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর স্মৃতিবিজড়িত মহাজাতি সদন থেকে সুকান্তর প্রতিকৃতি সংবলিত একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা জোড়াসাঁকো আসে। এখানে রথীন্দ্র মঞ্চে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় অংশ নেন শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়। সভাপতিত্ব করেন পবিত্র সরকার। এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিল কিশোর বাহিনী সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন।

কবি সুকান্তর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে উদ্‌যাপন কমিটি জেলায় জেলায় বর্ষব্যাপী আলোচনা সভা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদি নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। সুকান্ত জন্মশতবর্ষের সমাপ্তি কর্মসূচি হিসেবে গত ১৫ এবং ১৬ আগস্ট, ২০২৬ দু'দিন ধরে সুকান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সল্টলেকের পূর্বাঞ্চলীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের (ইজেডসিসি) ঐকতান প্রেক্ষাগৃহে। এই সম্মেলনে উপস্থিত থাকেন রাজ্যের বিভিন্ন জেলার কবি, সাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠকদের পাশাপাশি রাজ্যের জেলাস্তরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী সফল প্রতিযোগীরা। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন হিসেবে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ-র নেতৃবৃন্দ এবং কিশোর বাহিনীর রাজ্য সংগঠকরা।

১৫ আগস্ট ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে, সকাল সাড়ে এগারোটায় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে দু'দিনের সম্মেলনের সূচনা হয়।পতাকা উত্তোলন করেন জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক পবিত্র সরকার।

উদ্‌বোধনী অনুষ্ঠান

অনুষ্ঠানের সূচনায় প্রেক্ষাগৃহে সুকান্ত প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানানো হয়। উদ্‌বোধনী সংগীত পরিবেশন করে পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের কলকাতা জেলা কমিটির শিল্পীরা। কিশোর বাহিনীর 'শতায়ু সুকান্ত' শীর্ষক নৃত্যানুষ্ঠানের পর স্বাগত ভাষণ দেন পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের রাজ্য সম্পাদক রজত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বছরভর রাজ্যজুড়ে সুকান্ত জন্মশতবর্ষের নানা অনুষ্ঠানের বর্ণনা করে বলেন, আমরা এক কঠিন সময়ে সুকান্তর জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন করছি। শাসকদল এই উদ্‌যাপন করবে না। ত্রিপুরায় রাজ্য সরকার সুকান্ত পুরস্কার ফিরিয়ে নিয়েছে। পাঠ্যসূচি থেকে সুকান্তের কবিতাকে বাতিল করেছে। কাজেই সুকান্তকে আবার আমাদেরই মর্যাদার সঙ্গে ফিরিয়ে আনতে হবে। আজকের এই আক্রান্ত সময়ে সুকান্তকে হাতিয়ার করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। প্রগতিশীল ও বামমনস্ক মানুষ যাঁরা গণতন্ত্রের জন্য অবিরত লড়াই করছেন তাঁদের কাছে সুকান্ত এক আলোকবর্তিকা।

সুকান্ত সম্মেলনের উদ্‌বোধক বিশিষ্ট নাট্যকার চন্দন সেন বলেন, আমার ৮২ বছরের জীবনে অনেক ভালো নাটক লিখেছি। কিন্তু এগুলোর কোনো দাম নেই এদেশে। চিলিতে রাষ্ট্রপতি সালভাদোর আলেন্দেকে হত্যার পর খুন করা হয়েছিল সেদেশের কবি, গীতিকার ও সংগীতশিল্পী ভিক্টর জারাকে। আমার মনে হচ্ছে আমরা যেন এখন চিলিতে রয়েছি। আমার আগামী নাটক শতবর্ষে কমিউনিস্ট নেত্রী ইলা মিত্রর জীবন-নির্ভর 'বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ'। তিনি বলেন, আমাদের একমাত্র পরিচয় আমরা নাটক করি। লেডি রানু মুখার্জি, জওহরলাল নেহরুর স্মৃতিবিজড়িত একাদেমি অফ ফাইন আর্টস-এ কংগ্রেস সরকার থেকে শেষ সরকার কেউ সাহস পায়নি, কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেখানে রং পালটে দেওয়া হয়েছে। আমরা যদি এর প্রতিবাদ না করি ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। যতদিন আমাদের জীবন আছে আমরা আমাদের কথা বলে যাব। যতক্ষণ আমাদের দেহে প্রাণ আছে, আমাদের স্বপ্ন আছে, আমরা লড়াই করে যাব। একদিন সত্যিকারের দিন নিশ্চয়ই আসবে।

সভাপতির ভাষণে পবিত্র সরকার বলেন, জন্মদিনে যেমন একজন মানুষকে স্মরণ করার দিন, আবার কিছু সংকল্প গ্রহণ করারও দিন। সুকান্ত যা বলে গেছেন তা বাস্তবায়িত করার অঙ্গীকার আমাদের করতে হবে যাতে তিনি আমাদের জীবনে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকেন। তাই তাঁর কবিতার বাণী দেয়ালে দেয়ালে আমাদের লিখে যেতে হবে। সুকান্তর কবিতা যাতে পাঠ্যসূচি থেকে বাদ না যায় তার দাবি আমাদের জানাতে হবে। তবে পাঠ্যসূচি থেকে সুকান্তকে বাদ দিলেও কিছু যায় আসে না। তাঁর সৃষ্টি আমাদের মননে চিন্তায় রয়ে যাবে। আমাদের লড়াই শেষ হয়নি, এখনো চলছে। সেই লড়াইয়ে সুকান্ত আমাদের কাছে এক শানিত অস্ত্র।

উদ্‌বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রথম অধিবেশনে 'চল্লিশের দশকের কবিতা ও সুকান্ত ভট্টাচার্য' শিরোনামে এক আলোচনাচক্রে অংশ নেন গৌতম গুহরায় ও অধ্যাপক মানবেন্দ্রনাথ সাহা। সভামুখ্য ছিলেন অধ্যাপক সুমিতা চক্রবর্তী।

গৌতম গুহরায় তাঁর আলোচনায় চল্লিশের দশকের সৃজন বিশ্ব, চেতন বিশ্ব অনুষঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মুসলিম লিগের লাহোর প্রস্তাব, ৪৩-এর মন্বন্তর, আজাদ হিন্দ বাহিনীর পুনর্গঠন, আইএনএ-র ভূমিকা, রাইখস্ট্যাগে উড্ডীন লাল পতাকা, লালকেল্লায় আইএনএ-র বিচার, কলকাতায় রশিদ আলী দিবস ইত্যাদি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, সাম্যবাদের সেনানি হিসেবে সুকান্ত তখন ছিলেন রাস্তায়। সুকান্তর কবিতার পঙ্‌ক্তিতে বিদ্রোহ-বিপ্লবের স্পন্দন প্রসঙ্গে বলেন, অত্যন্ত জটিলতম সময়ে মানবমর্যাদা যখন আক্রান্ত, কবিতা তখন হয়ে ওঠে প্রতিরোধের প্রধান অস্ত্র।

মানবেন্দ্রনাথ সাহা তাঁর বক্তব্যে সুকান্তর রাজনৈতিক ও কবি জীবনের প্রেক্ষাপটে দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বাংলার অবস্থা বিশেষ করে ৪৩-এর মন্বন্তর, ৪৬-এর দাঙ্গা ইত্যাদি নানা দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে কবিতা লিখেছেন সুকান্ত। তাঁর কবিতা প্রচারধর্মী নয়, বরং নন্দনতত্ত্বেও দীপ্যমান। জোতদার-জমিদারের বিরুদ্ধে তাঁর কবিতা ঝলসে উঠেছে। আজ দেশজুড়ে যে সংকট, যে অন্ধকার নেমে এসেছে, তখন সুকান্তর কবিতাকে বেশি বেশি করে আমাদের মানুষের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

সুমিতা চক্রবর্তী উপসংহারে বলেন, সুকান্তর কবিতা পড়তে হলে সমসাময়িক ইতিহাসকে জানতে হবে। তাঁর সেপ্টেম্বর ৪৬, রোম ১৯৪৩, চট্টগ্রাম ১৯৪৩ শীর্ষক কবিতায় সমসাময়িক প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরেছেন। তাঁর কবিতায় শিল্পগুণও অনবদ্য। শাসকেরা পাঠ্যসূচিতে সুকান্তর কবিতা রাখুক বা না রাখুক, সুকান্তর কবিতা পঠিত হবেই।

এদিন বিকেলের অধিবেশনে উপস্থিত থাকেন সংগীত পরিচালক কল্যাণ সেন বরাট। তিনি তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণে উল্লেখ করেন, সুকান্ত ভট্টাচার্যকে নিয়ে দু'দিন ধরে অনুষ্ঠানের যে সাহস দেখিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘ, তার জন্য তাদের ধন্যবাদ জানাই। সুকান্ত কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হয়েই 'পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্‌সানো রুটি'র মতো পঙ্‌ক্তি রচনা করতে পেরেছিলেন। আমরা যে গান গাই, সেই গানই গেয়ে যাব। বক্তব্যের শেষে তিনি সুকান্তর 'অবাক পৃথিবী' গেয়ে শোনান।

এরপর এই অধিবেশনে নিউ থিয়েটার্স গ্রুপ এবং ভারতীয় গণনাট্য সংঘর শিল্পীরা সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন। 'অবাক পৃথিবী' গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করেন ডঃ সুগত দাস।

এরপর কবি সুকান্তকে নিয়ে লেখা স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন বিভিন্ন জেলার কবিরা। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক ছিলেন আব্দুল মান্নান চৌধুরী। প্রথম দিনের সমাপ্তি অধিবেশনে সমবেত আবৃত্তি পরিবেশন করে 'কথাসরিৎ' হাওড়া। সুকান্ত রচিত কবিতা 'একটি মোরগের কাহিনী' আঞ্চলিক ভাষায় পরিবেশন করেন জগদীশ পাল (ঝাড়গ্রাম)। কিশোরনাথ চক্রবর্তী (কোচবিহার) সংগীত পরিবেশন করেন। সবশেষে নৃত্য ও সংগীত পরিবেশন করে 'রক্তকরবী' ব্যালে ট্রুপ।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই সুকান্ত সম্মেলনে এদিন হিন্দি, ইংরেজি, উর্দু ও মালয়ালম ভাষায় অনূদিত 'হে মহাজীবন', 'ছাড়পত্র', 'একটি মোরগের কাহিনী', এবং 'আঠারো বছর বয়স' কবিতার একটি ফোল্ডার প্রকাশিত হয়। প্রেক্ষাগৃহের প্রবেশপথের সামনে কবি সুকান্তর জীবন-নির্ভর একটি পোস্টার প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়েছিল।


১৬ আগস্ট, দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান

এদিন সকালে উদ্‌বোধনী সংগীত পরিবেশন করেন আশিস বিশ্বাস (দক্ষিণ ২৪ পরগনা)। সুকান্তর কবিতা 'প্রিয়তমাসু' আবৃত্তি করেন পদ্মশ্রী মাহাতো (ঝাড়গ্রাম)।

এদিন প্রথম পর্বের আলোচনা সভার বিষয় ছিল: 'সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা: বিকল্প নন্দনতত্ত্বের সন্ধানে'।

সভামুখ্য: অধ্যাপক পল্লব সেনগুপ্ত। আলোচক ছিলেন: অধ্যাপক আব্দুল কাফি, শুভময় মণ্ডল।

আব্দুল কাফি তাঁর আলোচনায় উল্লেখ করেন, নন্দনতত্ত্বের মধ্যে একটি এলিট ধারণা আছে। কেন একদল মানুষের কোনো রচনা ভালো লাগছে তা বিশ্লেষণ করে তাত্ত্বিকরা একটা ধারণা করেন। পুরোনো তত্ত্ব বাতিল করে নতুন তত্ত্ব আসে। কিন্তু কোনো তত্ত্ব দিয়েই পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রচনা ব্যাখ্যা করা যায় না। ফলে নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে রচনার সংঘাত রচিত হয়। সুকান্তের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। অনেকে তাঁর রচনা বোঝার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা তাঁদের পুরোনো ধারণা থেকে সুকান্তর রচনা তেমন কবিতা হয়ে ওঠেনি বলে বাতিল করেছেন। তাঁদের মধ্যে জ্বলজ্বল করছেন কবি বুদ্ধদেব বসু। জীবনানন্দ-এর ক্ষেত্রেও তিনি তাই করেছেন। বুদ্ধদেব বসু সুকান্তের কবিতা আবৃত্তির ক্ষেত্রে মন্তব্য করেছিলেন, 'বেশ চেঁচিয়ে বলেছে সুকান্ত'। সুকান্তর কবিতার বিষয়বস্তু নয়, তাঁর চেঁচিয়ে উচ্চারণ করাটাই শুধু বুদ্ধদেব বসুর নজরে এসেছে। বুদ্ধদেব বসু তাঁর নন্দনতাত্ত্বিক সংস্কার থেকে এভাবে সুকান্তকে নাকচ করার চেষ্টা করেছেন। এমনকী তিনি সুকান্তকে এও বলেছিলেন যে, 'রাজনৈতিক কবিতা লিখে তুমি শক্তির অপচয় করছো।'

সুকান্তর কবিতায় এলিট নন্দনতত্ত্বের প্রক্রিয়া চাপিয়ে দিলে তা অন্যায্য হয়, তা একদেশদর্শী ভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়া হয়। সুকান্ত কেন ৪৬-এর আগস্ট মাসের ভয়ংকর দাঙ্গা নিয়ে লিখবেন, কেন 'আকাল' কবিতা সংকলন প্রকাশ করবেন, কেনই বা দুর্ভিক্ষের সময় কবিতার জন্য ছুটে বেড়াবেন, কেন তিনি লঙ্গরখানায় যাবেন, তাঁর কবিতায় শ্রমিক-কৃষকের অভূতপূর্ব ধর্মঘটের কথা তুলে ধরবেন, সমাজকে পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি রচনা করবেন — এসব যদি বুদ্ধদেব বসুদের এলিট তত্ত্বের জাঁতাকলে পিষে অনুভব করা হয় তাহলে কিছুই মিলবে না। আসলে সুকান্তর কবিতা পড়ে যে সৌন্দর্য অনুভূতি হয়, সেখানে দেখা যায় সুকান্তর সততায় কোনো খাদ নেই।

আব্দুল কাফির আলোচনার সূত্রে পল্লব সেনগুপ্ত একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, বুদ্ধদেব বসু একবার সুকান্তকে বলেছিলেন, তুমি কবিতাকে আর কত নিচে নামাবে? উত্তরে সুকান্ত বলেছিলেন, যতক্ষণ তা জনতার দরবারে নিয়ে যেতে না পারি।

শুভময় মণ্ডল তাঁর আলোচনায় উল্লেখ করেন, সুকান্তের কবিতায় বিকল্প নন্দনতত্ত্ব কেন, কেন তাঁর রচনা মূল নন্দনতত্ত্বে ধরা যাবে না?

এইসূত্রেই তিনি বলেন, কার্ল মার্কসকে ভাবতে হচ্ছে তাঁর সমগ্র লেখার বুননে শেকসপিয়রকে ধরতে পারবেন কিনা। মার্কস-এঙ্গেলস সমগ্র বিশ্বের নন্দনতত্ত্বের বোঝা আমাদের দিয়ে গেলেন, তাঁদের নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব সৃষ্টি করলেন — এলিটিজমকে ভাঙবার অসাধারণ সূত্রায়ণ করলেন সমাজকে পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে।

শুভময় মণ্ডল স্পষ্টতই বলেন, সুকান্তর কবিতা বিশ্লেষণ করতে বিকল্প নন্দনতত্ত্বের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্বের। প্রসঙ্গক্রমে তিনি উল্লেখ করেন, মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ সুকান্তকে নতুন ভাবে চেনালেন আমাদের। বললেন, সমগ্র প্রগতিকবিতার ঐতিহ্য স্মরণে রেখে বলা যায়, এমন কবি খুব একটা নেই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সুকান্তের মৃত্যুর পর 'স্বাধীনতা' পত্রিকায় লিখেছেন, 'কবিও পেয়ে গেছে নতুন যুগ।' তিনিও সুকান্তকে নতুন ভাবে তুলে ধরলেন আমাদের সামনে।

পল্লব সেনগুপ্ত শুভময়ের আলোচনার সূত্রে বলেন, প্রচলিত নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে মাটি সংলগ্ন মানুষের রচনা নেই। আবার বিকল্প নন্দনতত্ত্ব সবসময় বিপ্লবী স্লোগান নিয়ে চলে না।

এই মনোজ্ঞ আলোচনা পর 'নেই অমরত্তের লোভ' শীর্ষক স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সুকান্ত জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে উদ্‌যাপন কমিটির পক্ষ থেকে এটি প্রকাশিত হয়।

পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘের রাজ্য সম্পাদক রজত বন্দ্যোপাধ্যায় স্মারক গ্রন্থটি অধ্যাপক গোপা দত্তের হাতে তুলে দেন। গোপা দত্ত সুকান্ত ভট্টাচার্যের আশ্চর্য প্রতিভার কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলার দু'জন প্রতিভা জীবদ্দশায় তাঁদের রচনা সংকলন দেখে যেতে পারেননি। একজন হলেন সুকুমার রায়, অপরজন হলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। ষাটের দশকের বিক্ষুব্ধ সময়ে আমার প্রথম 'ছাড়পত্র' দেখার সুযোগ হয়। কি অসম্ভব ভালো লেগেছিল তাঁর কবিতা। তাঁর কবিতার প্রতি মুগ্ধতা আজও কমেনি। কবি বুদ্ধদেব বসুর প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি, রাজনৈতিক কবিতা লিখে সুকান্ত এতোটুকু ভুল করেননি। সুকান্ত যথার্থ বলেছিলেন, এদেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে। তাঁর স্বপ্ন সার্থক হোক এই প্রত্যাশা করি।

রজত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এই গ্রন্থ প্রকাশ শুধু আমাদের কর্তব্যপালন নয়। সুকান্ত চেয়েছিলেন এই পৃথিবী নবজাতকের বাসযোগ্য হয়ে উঠুক, কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন স্বার্থক হয়নি। তাঁর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লড়াই আমাদের জারি রাখতে হবে।

এরপর সুকান্ত ভট্টাচার্য জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন উপলক্ষে জেলায় জেলায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় স্থানাধিকারীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

এরপর শ্রুতিনাটক পরিবেশন করে 'শ্রুত্যনুপ্রাস' (পশ্চিম বর্ধমান)।

সুকান্তর বিখ্যাত কবিতা 'হে মহাজীবন' বাংলায় পাঠ করেন মালয়ালি মেয়ে শ্রেষ্মা বালকৃষ্ণন এবং মালয়ালম ভাষায় পাঠ করেন কৃষ্ণা রায়চৌধুরী।

এই অধিবেশনের শেষে সুকান্তকে নিয়ে নির্মীয়মাণ তথ্যচিত্রের ট্রেলার প্রদর্শিত হয়।

এরপরের অধিবেশনে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। বিষয়: 'বহুমাত্রিক সুকান্ত'।

আলোচকদের মধ্যে: 'গানের সুকান্ত' বিষয়ে বলেন, সংগীতশিল্পী শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার; 'গল্পের সুকান্ত' বিষয় বলেন কবি অরিন্দম চট্টোপাধ্যায়। 'চিঠিপত্রের সুকান্ত' — এ বিষয়ে আলোচনা করেন অধ্যাপক শ্যামল চক্রবর্তী এবং 'ছোটোদের সুকান্ত' নিয়ে আলোচনা করেন ডঃ পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। সভামুখ্য ছিলেন যশোধরা রায়চৌধুরী।

শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার বলেন, কেউ বলেছেন গানের সুকান্ত, আবার কেউ সুকান্ত সংগীত। তাঁর কাব্য বাংলা সংগীতকে এক অনন্য জায়গায় নিয়ে গেছে। তাঁর কবিতার ভাষায় নতুন প্রজন্মের ছোঁয়া থাকলেও গানের ক্ষেত্রে ছিলেন তিনি রবীন্দ্রঅনুসারী। তাঁর গীতিগুচ্ছে ১৯টি গান রয়েছে, এছাড়া রয়েছে গীতিনাট্য। সুকান্তর রচনায় সলিল চৌধুরী সুর করেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল সুকান্তর জীবদ্দশায় সুর করা, কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। সুকান্তর কবিতা আবৃত্তির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবে সুর সংযোজনা করেন সলিল চৌধুরী। 'রানার' কবিতার সুর করতে গিয়ে তিনি ভাবলেন, রানার তো ছুটছে। রবীন্দ্রনাথ রাগের দাসত্ব ভেঙেছিলেন। আর সুকান্তর কবিতার সুরারোপ করতে গিয়ে সলিল চৌধুরী স্কেলের দাসত্ব ভাঙেন।

তিনি বলেন, সলিল চৌধুরীর দেখানো পথ ধরে গণনাট্য সংঘের অনেকেই সুকান্তর কবিতায় সুর সংযোজনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, অনল চট্টোপাধ্যায় এবং দিলীপ সেনগুপ্ত। দিলীপ সেনগুপ্তের সুর করা কিছু গান শুনলে মনে হবে, এগুলি কবিতা নয় আসলে গানই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সুকান্তর অনেক কবিতা সুর করে গাওয়া হয়েছে। যাঁরা সুর করেছেন তাঁদের মধ্যে অজিত রায়, লুৎফর রহমান উল্লেখযোগ্য। আসলে যেখানে বামপন্থার উদ্‌বোধন হচ্ছে, সেখানেই সুকান্ত। ১৯৭৮ সালে ত্রিপুরায় হীরালাল সেন সুকান্তর কবিতায় সুর করেন। অসমে ৭০ দশকের শেষে গুয়াহাটিতে ইউসিএফ সুকান্তর অনেক গান করেছে, সেগুলিতে সুর দিয়েছেন স্বপন দে। গণনাট্যশিল্পী বিভুরঞ্জন চৌধুরী সুকান্তর 'বোধন' কবিতার সুরারোপ করেন। শিলচর শহরে সুর করেন শিবেন চক্রবর্তী।

তিনি বলেন, সলিল চৌধুরীর 'ঢেউ উঠছে কারা টুটছে' যেন সুকান্তর কবিতার ভাষারই প্রতিফলন। সুকান্তর কবিতা উচ্চারণ করলেই একটা সাংগীতিক অনুরণন হয়।

অরিন্দম চট্টোপাধ্যায় তাঁর আলোচনায় বলেন, সুকান্তর প্রথম পরিচয় তিনি কবি। তাঁর কবিতা সিলেবাস থেকে বাদ দিলেও হৃদয় থেকে মুছে দেওয়া যাবে না। সুকান্ত এখন ইতিহাস। সারস্বত লাইব্রেরি প্রকাশিত সুকান্ত সমগ্রের পাঁচটি সংস্করণে একটি গল্পও ছিল না। ১৯৭৩ সালের ষষ্ঠ সংস্করণে পাঁচটি গল্প ছাপা হয়। দে'জ পাবলিশিং-এর সংস্করণে ৬টি গল্প ছাপা হয়। এছাড়া অরুণাচল বসুর চিঠিতে দুটি গল্পের উল্লেখ আছে। এভাবে দেখা যায় সুকান্তর মোট ১১টি গল্প রয়েছে, যেগুলি নিয়ে 'সুকান্ত ভট্টাচার্যের গল্প' শিরোনামে একটি সংকলন হতে পারে। 'ক্ষুধা' ও 'দুর্বোধ্য' গল্প সুকান্তর শ্রেষ্ঠ গল্প বলে উল্লেখ করেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। সুকান্তর গল্প বাংলা সাহিত্য থেকে মুছে যাবার নয়।

শ্যামল চক্রবর্তী সুকান্তর চিঠিপত্র বিষয়ে বলতে গিয়ে বলেন, রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র আশি খণ্ডে বিশ্বভারতী প্রকাশ করেছ। প্রধানত বন্ধু অরুণাচল বসুকে কেন্দ্র করেই সুকান্তর ৩২টা চিঠি রয়েছে। নৃপেন চক্রবর্তী একবার বলেছিলেন, সুকান্তকে আমরা বাঁচাতে পারিনি। বাংলাদেশে দুইজন কবি যক্ষায় মারা যান। একজন হলেন তরু দত্ত, যিনি প্রধানত ইংরেজিতে লিখেছেন, আরেকজন হলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। এখন আর কেউ কাউকে চিঠি দেয় না। চিঠির মধ্যে দিয়ে অনেক সাহিত্য উপাদান বেরিয়ে আসে। সুকান্তর চিঠিতে তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের স্বনামধন্য লেখকদের নাম উল্লেখ রয়েছে। তিনি অরুণাচল বসুকে আক্ষেপ করে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, পরিবর্তনহীন রাজনীতি নিয়ে কালক্ষয় করছি।

ছোটোদের সুকান্ত বিষয়ে পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, সুকান্ত এখনো আমাদের জাগিয়ে তোলার, জাগিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখেন। তিনি এমন জীবনধারা বহন করেছেন তাতে তো তিনি কবি হবেনই। তিনি ছিলেন সময় ও সমাজের কাছে দায়বদ্ধ। তিনি আলো যতটা দেখেছেন, অন্ধকার দেখেছেন তার চেয়ে বেশি।

তিনি উল্লেখ করেন, সুকান্তর কবিতা এক বৃহত্তর ব্যাপ্তি নিয়ে এখনো জ্বলজ্বল করছে। তাঁর সাহিত্য 'মিঠেকড়া' নিয়ে অনেকের মনে হতে পারে সাহিত্যের ধারাতো সুকান্তর মধ্যে নেই, ব্যতিক্রমী। কিছু কিছু মানুষ লেখেন কল্পলোকের গল্পকথা। তাঁরা কল্পনার জগতে ভাসমান। সেইসব লেখা ছোটোদের সময় ও জীবনকে চেনায় না, সমাজকে চেনায় না। এখন ধরেই নেওয়া হয়েছে ছোটোদের গল্প মানেই রক্তপাত, বীভৎসতা, খুনোখুনি ইত্যাদি। ছোটোদের সাহিত্যে ভূতের গল্প, গোয়েন্দা কাহিনি লেখা হবে। এধরনের লেখা কি ছোটোদের জীবন চেনায়? সুকান্ত ছোটোদের জন্য যা লিখেছেন, 'মিঠেকড়া'য় যে ১৫টি ছড়া ও পদ্য রয়েছে, এগুলি ব্যাপ্তিতে বহুদূর বিস্তৃত। সেসবের মধ্যে রয়েছে জীবনের কথা, সময়ের কথা। ছোটোদের জন্য লেখায় যুগে যুগে সময় ও কালের কথা এসেছে। 'মিঠেকড়া'র ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটি হয়েছে।

অন্তিম অধিবেশনের শুরুতে কিশোর বাহিনীর পক্ষ থেকে সংগীত পরিবেশন করেন বিজয়া পাল। এরপর ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সীমান্তিক শাখার শিল্পীরা আবৃত্তি ও সংগীত পরিবেশন করেন।

কবীর সেন বরাটের পরিচালনায় নৃত্যালেখ্য পরিবেশন করেন 'পথের পাঁচালি'র শিল্পীরা।

সবশেষে সুকান্তের 'রানার' গানটি পরিবেশন করেন আরাত্রিকা সিনহা।

দু'দিনের সমগ্র অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিলেন উর্মিমালা বন্দ্যোপাধ্যায়।

উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ (পশ্চিমবঙ্গ)-র রাজ্য সম্পাদক দিব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়, কিশোর বাহিনীর মুখ্য সংগঠক পীযূষ ধর প্রমুখ।

সমাপ্তিতে সুকান্ত জন্মশতবর্ষ উদ্‌যাপন কমিটির সম্পাদক সুব্রত চট্টোপাধ্যায় উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

প্রতিবেদক: সন্দীপ দে
ছবি: শ্রীনিবাস ধর